আপেক্ষিক


ঘরটায় কোনোক্রমে ঢুকে দরজাটা পিঠ দিয়ে চেপে দাঁড়াল স্বস্তিক। বাঁ হাতে খিলটা তুলতে তুলতে ঘরের ভেতরটা জরিপ করে নিচ্ছিল ও। এই প্রথম দেখছে তো। সিনেমায় সাধারণত যেমন দেখে এসেছে এ ঘর তেমন না। ঘরটা একটু ছোট খুপরি গোছের, অন্ধকার অন্ধকার মত। শুধু লাল রঙের নাইট ল্যাম্পটা মেলে। বিছানা সর্বস্ব ঘরে খাটের পাশে একটা আধ ভাঙা আলমারি আর একটা গোল টেবিলে ছড়ানো সাজের জিনসপত্র। টেবিলের পিছনে দেয়ালে ঝোলানো বড় আয়না। ছোট ছোট দুটো জানলা আছে দুই দেয়ালে, সেগুলো বন্ধ। বাইরে বাজি ফাটছে। সামনে দেওয়ালী - কেউ হউত বাজীর শব্দ পরীক্ষা করছে। কিন্তু সে শব্দ ভেতরে বড় একটা আসছে না। দেয়াল গুলো বেশ মোটা।
খিলটা হাল্কা করে তুলে দিয়ে স্বস্তিক এগিয়ে এল বিছানার সামনে। বুকের ভেতর দামামার আওয়াজ - এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা - বলে বোঝানোর মত নয়।
বিছানায় ফিল্মি কায়দায় একটা পা মেলে আর একটা পা ভাঁজ করে দু হাতে জড়িয়ে হাঁটুতে মাথা রেখে একটা বছর কুড়ির মেয়ে বসে আছে। পরনে শরীর ঢাকা সালোয়ার-কামিজ, সাথে মাথায় ঢাকা ফিনফিনে চেলি ওড়না। শ্যাম্পুকরা ফোলা চুলের গোছা পিঠময় ছড়ানো।
অল্প আলোয় কাছে এসে তবেই বোঝা গেল মেয়েটা চেয়ে আছে আর তার দিকেই দেখছে। স্বস্তিকের গুড়গুড়ুনিটা এবার ওলট পালট হতে শুরু করল। এরকম ভাবে এর আগে কখনও এত কাছ থেকে কোনো যুবতী মেয়েকে এরকম দৃষ্টিতে ও দেখেনি আর মেয়েটা পালটা দৃষ্টিতে চেয়ে আছে - সেটা আরো আশ্চর্যের।
বোধ হয় বেশ খানিকক্ষণ ওভাবেই দাঁড়িয়ে ছিল ও। মেয়েটা পাতলা মিষ্টি স্বরে আদর করে বলল, "ভায়া, এসো, কাজ সেরে নাও। গেটে মাসিকে তো কড়কড়ে নোট গুনে দিয়ে এসেছ, এখন কাজ সেরে না নিলে বেরোনোর পর আক্ষেপ হবে।"
হুঁশ পেল স্বস্তিক। বেশ বড় মাপের খদ্দের ও আজ। হাজার টাকা। হাজার টাকার বিনিময়ে এত সুন্দর একটা মেয়ে... কি আশ্চর্য। মেয়েটা এবার মাথা তুলল, "প্রথম এসেছ বুঝি আমাদের পাড়ায়?"
মন্ত্রমুগ্ধের মত স্বস্তিক উপর-নীচ মাথা নাড়ল।
"জানি। রোজেরই একটা না একটা এরকম কাস্টোমার আসে। পিকিউলিয়ার টাইপ। এসে ভোম্বলের মত দাঁড়িয়ে থাকে, নয়ত পাগলের মত যাতা করে হন্তদন্ত পালায়। তখন দেখলে মনে হয় ভয় পেয়ে গেছে।"
"তাই নাকি!" মেয়েটার পাশে বসে পড়ল ও। "আমার যেন কেমন ইয়ে লাগছে। কিছু মনে করবেন না।"
পা টা নামাল মেয়েটা। কি অপূর্ব সুন্দরী। হাল্কা আলোয় চোখের কোন থেকে নাক ঠোঁট একদম পাথরে খোদাই করা মূর্তির মত। এম্বস করা কাজে যেমন উঁচুনীচু আলোছায়া খেলা করে ঠিক সেইরকম ছায়াগুলো জ্যামিতিক আকার নিয়ে খেলতে শুরু করল। মেয়েটা খিল খিল করে হাসল। "আপনি আজ্ঞে? দাদা পারো বটে। প্রথম প্রথম অনেকেই আসে, কিন্তু এমন কথা কেও বলে না।"
হাসিতে বোধ হয় হাওয়াটা সচল হল। স্বস্তিকও একটু হেসে বলল, "তুমিও তো দাদা বললে, এটাও কি বে-আইনি সম্বোধন নয়?"
"যে বয়সের লোক আসে সেরকম সম্বোধন। তবে বুড়ো এলে তাদের কাকু বলা ছাড়া উপায় থাকে না। নাহলে আবার ক্ষেপে যায়।"
"বুড়ো আসে তোমার কাছে? আর তুমি... ছিঃ!" স্বস্তিকের নিজের কথা নিজের কাছেই ন্যাকা ন্যাকা ঠেকল। আরে কাস্টোমার যদি বুড়ো হয় তো এরা কি করবে। বুড়োদেরও তো একটা শখ আহ্লাদ থাকে, সেটাও তো মেটানোর প্রয়োজন।
"দাদা, এটা ব্যবসা। যেমন খদ্দেরই আসুক না কেন, তাকে এন্টারটেইন করতে হবে। সেটাই পারফেক্ট বিজনেস পার্সনের লক্ষ্য। তবে দাদা একটা কথা বলি, বুড়োরা কিন্তু একটু বেশি এনার্জাইজড থাকে। কষ্ট দেয় বেশি। আর কাকু গোছের লোকগুলো বড্ড লেজি। আমায় খাটায়। তোমার বয়েস কত?"
"ছাব্বিশ। তোমার?"
"ষোল।" বলে মেয়েটা আবার ঝরঝর করে হেসে দিল।" বয়স নিয়ে কি হবে, দেখছো না, দাদা বলে ডাকলাম। তার মানে ছোটই হব। আর যাই হোক না কেন, টান টান আছি। দেখো হাত দিয়ে দেখো।" মেয়েটা চট করে স্বস্তিকের ডান হাতটা খামচে ধরে বুকের কাছে টেনে নিয়ে গেল। ছোঁয়া লাগতেই বিদ্যুতের মত এক হ্যাঁচকায় স্বস্তিক হাতটা ছাড়িয়ে নিল। তার পরই ভুল বুঝতে পারল। এখানে এসে পড়ার পর এই আচরণ এক্কেবারেই যুক্তিহীন। আসার আগে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনেক সুযোহ পেয়েছে-তখনই মনস্থির করা উচিত ছিল। ব্যাপারটা সহজ করার জন্য মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল, "নামটা জানা যাবে?"
"কি হল, অচ্ছুৎ নাকি আমি? সরে গেলে যে? এ ধরণের আচরণ অত্যন্ত অসম্মানজনক। আধা ঘন্টা সময় কিনে নিয়েছ দাদা, যা চাও করে নাও। যে নামে খুশি ডেকে নাও - রীতা, মিতা, কেটি, টেঁপি, সোনা, শবনম, সাহানা যা খুশি। কিন্তু ওয়েস্ট কোরো না। কাল প্রাইভেটে স্যারের কাছে পরীক্ষা আছে, রাতে পড়তে হবে।"
আশ্চর্য হয়ে গেল এবার স্বস্তিক। "তুমি পড়াশোনাও কর? এ-ও সম্ভব?"
"আবাল নাকি? আমার বয়েসি সবাই এখানে তাই করে। এটা তো পার্ট টাইম জব। আমাদের কি লাইফ নেই নাকি? দাদা, বেশি খুঁচিয়ো না। তাড়াতাড়ি কাজ সেরে কেটে পড়ো।" মেয়েটা এবার চেলিটা নামিয়ে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল। তারপর সুন্দর ভঙ্গিতে উর্ধাঙ্গের পোশাক খুলতে লাগল। স্বস্তিক বাধা দিল না। উলটো দিকে চেয়ে রইল।
"নয় নয় করে হলেও দুবছর আছি এ ব্যবসায়। তোমাদের আর কি, বাবার পয়সা আছে, কিস্যু অভাব অনটন নেই। খাও দাও বাওয়াল করে বেড়াও। আর এভাবে আমাদের কাছে শখ মেটাতে আসো। তা, দাদা, পার্সোনাল লাইফে কি করা হয়?"
"এমবিএ পড়ছি। সপ্তা খানেক হল জব পেয়ে গেছি। ব্যাঙ্গালোরে সেটেলমেন্ট। তো শেষ চটকায় মনে হল, জীবনের কথা তো আর বলা যায়না, যদি আর ওয়েস্টবেঙ্গল এ ফিরতে না পারি... বাঙালী সমস্ত জিনিষেরই টেস্ট করা আছে, শুধু একটা জিনিস বাকি পড়ে গেছিল। চলে এলাম তাই। তুমি কি পড়ছ?"
মেয়েটা একটুক্ষণ চুপ করে থেকে নাক দিয়ে হুঁঃ করে শব্দ করল। বলল, "দাদা, আমাদের মত মেয়েদের পার্সোনাল লাইফ আর ব্যবসা সম্পূর্ণ দুটো হেমিস্ফিয়ারের ব্যাপার। গুলিয়ে ফেললে হয় না। পার্সোনাল লাইফে কি করি না করি সেগুলো মারাত্মক কনফিডেনসিয়াল ব্যাপার। সো, ডোন্ট থিঙ্ক দ্যাট আই অ্যাম গোয়িং টু রিভিল ইট সো ইজিলি। বড় কাস্টোমার হলে না হয় দেখা যাবে, কিন্তু নিউ কাস্টোমারকে? কভি নেহি।"
"তোমার এই লাইফটা ভালো লাগে?" স্বস্তিক চঞ্চল হয়ে উঠল হঠাৎ। বাঁ হাত দিয়ে খাটের মাথার কাছে নকশাগুলোয় বিলি কাটতে কাটতে ঘরময় দৃষ্টি ঘোরাতে লাগল।
"পয়সা, দাদা, পয়সা, এ শরীরে আছেটা কি! তুমি নিতে পারো আর আমি দিতে পারি না?"
"তুমি মিথ্যে বলছ।" স্বস্তিকের কন্ঠস্বর বেশ দৃঢ়।
মেয়েটা পোশাকটা খুলে আবার হাতেই ধরে রইল। মুহুর্তের মধ্যে ঘরের বাতাসটা বদলে গেল। একটা ছটফটানি গোছের নীরব তাণ্ডব যেন চলেছে। বাতির শিখা ধরলে সে তাণ্ডবের নাচ দেখা সম্ভব। প্রায় মিনিটখানেক সব চুপ থাকার পর মেয়েটা উল্টোদিকে চেয়ে জোরে জোরেই বলল, "এরকম ও খদ্দের আছে, শালা সাহস নেই, বাপের পয়সা ওড়াতে চলে আসে। বালের পুরুষত্ব নেই আর মনে মনে বাই।"
স্বস্তিক তক্ষুণিই মনস্থির করে নিল।  উঠে দাঁড়িয়ে মেয়েটার দিকে পিছন ঘুরে কোমরের বেল্টটা আলগা করে জিন্সের হুকটা খুলে ভেতরে হাত ঢোকাল। জাঙ্গিয়ার কোন কুঠুরিতে একটা দু হাজারের নোট ভরা ছিল, সেটা বের করে মেয়েটার ডান হাতের মুঠোটা খুলে হাতে দিয়ে আবার মুঠোটা পাকিয়ে দিল। মেয়েটা মাথা নীচু করেই বসে। বাম হাতের মুঠোয় জামাটা ধরে আছে। "নামটা তো জানা হল না, সে যাই হোক, বোন, তোকে ঠিক মা দূর্গার মত দেখতে। দাদার কাছ থেকে উপহার হিসেবে টাকাটা রাখ, পুজোয় একটা শাড়ী কিনিস। কাঁচা হলুদ রঙের। তোকে মানাবে। আর এ পাড়ায় পারলে কম আসিস।" বেল্টটা বাঁধতে বাঁধতে স্বস্তিক মেয়েটার দিকে ঘুরল। সে মুখ তুলে চাইছে না আর। বাঁ হাতের সালোয়ারটা টেনে বুকের কাছে ধরে আছে লজ্জা আড়াল করার জন্য। স্বস্তিক ওর মুখটা দুহাতে ধরে কপালে একটা স্নেহের চুমু দিল, "আসি রে। নিচে বারান্দায় একজন বন্ধু বসে আছে। তাকে আবার বানিয়ে গল্প শোনাতে হবে।"
খিল খুলে যখন স্বস্তিক বেরিয়ে যাচ্ছে তখন একবার আবার ঘুরে চাইল। মেয়েটা দুহাতে সালোয়ারটা টেনে দাদার কাছে লজ্জা ঢেকে রেখেছে। পাথরের ভাষ্কর্য থেকে টপ করে এক ফোঁটা জল পড়ে লাল আলোয় মিলিয়ে গেল।

1 টি মন্তব্য: