সিঁড়ি

বাইকটা দাঁড় করালাম। চাবি লক করলাম কি না মনে নেই। লাইট হয়ত জ্বলছে, পিছনে গাড়ির হেডল্যাম্পে। বেশিক্ষণ জ্বললে ব্যাটারি ফুরিয়ে যাবে,
স্টার্ট নেবে না। তাও খেয়াল নেই আমার। মুগ্ধের মত হেঁটে এগিয়ে গেলাম। পাহাড়ী পথ। দুটো চওড়া পাথরের মাঝে ফাঁকটুকু কাঠের পাটাতন দিয়ে বেঁধে সমান মেঝে করা হয়েছে। দুদিকে কোঠা বাড়ি। রাস্তা আপাতত শেষ কারণ কাঠের মেঝে বরাবর গটগটিয়ে হেঁটে গিয়ে দেখলাম সামনেও রাস্তার মুখে ঠায় দাঁড়িয়ে একটা পুরোনো শ্যাওলা ধরা কোঠা দোতলা বাড়ি। পিছনে তার সূর্য অস্ত যাচ্ছে। হাতে কি ছিল জানি না। পকেটেও না। আসলে জানার দরকারই নেই কিছু সাথে ছিল কি না। বাড়িটা ছিল, আমি ছিলাম আর একটা নেশা ছিল। না, আমি নেশা করি না। সিগ্রেট, মদ, গাঁজা এসব ছুঁইনি কোনোদিন। ছবিটায় নেশা ছিল। চোখে যেটা দেখছিলাম। সামনের বাড়িটা। ওটা কি পাহাড়ের উপরেই নাকি ওটা বড় পাথর দুটো থেকে এগিয়ে বেরিয়ে শূন্যে ভাসমান? পায়ের নীচে তাকাইনি। না, আমি উচ্চতায় ভয় পাই। উঠতে ভয় পাই। ছোটবেলায় লুকোচুরি খেলতে খেলতে নেমেছিলাম খুব। ভুলেও বুঝিনি যে ওঠা কঠিন হবে। পিছনের দিকের বাঁশঝাড়ের দিকে নেমে গেছিলাম। ওখান টা বড্ড খাড়াই। জানতাম ওখানে কেউ খুঁজবে না। ওখানে দিন-দুপুরে গোসাপ চরে বেড়ায়। বাঁশের পচা পাতায় পা রাখলে আসেপাশে ব্যাং - জলফড়িং নড়ে ওঠে। উঠতে পারিনি। আসলে নামাটা সোজা। সেই আমি কি জানতাম...?

হেঁটে যাই কোঠা বারান্দায়। মড়মড় করে ওঠে পুরানো কাঠের পাটা। পেরেক এর সাথে কাঠের ঘষা লেগে তীক্ষ্ণ ক্যাঁচ কোঁচ শব্দ ওঠে। গায়ে কাঁটা দেয়। ব্যাঙ - জলফড়িঙের স্মৃতি লাফিয়ে ওঠে। কিন্তু আমি তো নামিনি কোথাও। পাশে চেয়ে দেখি বারান্দার ঝুলে ক্ষয়ে পচে খসে যাওয়া কাঠ আর লোহার রেলিং। পদশব্দে তারা নেচে নেচে উঠছে যেন। ব্যঙ্গ নাকি? তবে কি আমি নামছি? অল্টিমিটার আনিনি। পিঠে রুকস্যাকও নেই। থোড়াই আমি ট্রেকিং এ এসেছি। এ তো সান্ধ্যভ্রমণ ছিল। হঠাৎ বদলে গেল কেন?

দরজায় ঘুণ ধরে আছে। একমাত্র দরজা। বন্ধ। হাত ছোঁয়াতেই খুলে গেল। যেন আমার অপেক্ষাতেই ছিল। তবু, তাই যদি হবে তবে খোলা ছিল না কেন? খট করে মরচে ধরা পাখি-কব্জাটা মটকে গিয়ে কেতরে গেল দরজাটা একদিকে। দুলতে লাগল নাচিয়ে মাকড়সার মত - কিঁচ্ কিঁচ্। পা রাখলাম ভিতরে। হাওয়াও হাতছানি দেয়। যেন বাইরের দমকা বাতাস আমাকে ঠেলে নিয়ে গেল অন্দরমহলের আনুকুল্যে। সূর্য কি ডুবে গেছে? ভিতরে তো মিশকালো অন্ধকার হবার কথা! তাহলে এত আলো কেন? কোত্থেকে এত আলো আসছে? মেঝেয় জমা ধূলোয় পা ফেলতেই মেঝে কথা বলে উঠছে যেন। মেঝের কাঠের ফাঁকগুলো থেকে দেখা যাচ্ছে ঘন অ্যাসফাল্টের মত কালো অন্ধকার। নীচে বুঝি কিছু নেই, খাদ ছাড়া। গা ছমছম। বুকে সাহস আছে কি এগিয়ে যাওয়ার? বুকে হাত রাখলাম। আলো দাও প্রভু। পথ ভুল করেছি কি? নাকি এ বাড়ি আমার? বুক থেকে আলো ছড়িয়ে গেছে। আমার হাত পা পিঠ ঠোঁট বাহু কোমর নাভি উরু গলা আঙুল স্তন যোনি থেকে আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে। আমি কি তবে নারী? কিন্তু আমায় তো নারী হতে নেই! পথ নাকি নারীর নয়, সিঁড়িও নয়। নারীর তাহলে কি?

কেউ ডাকছে। চমক লাগল। এ বাড়িতে কেউ বাস করে? তাই কি করে সম্ভব! মেঝেয় পুরু ধূলোর আস্তরণ - পদচিহ্নের অস্তিত্বই নেই। এগিয়ে চললাম। সামনে সিঁড়ি। বেয়ে উঠে ডানদিকে বারান্দা বেয়ে হেঁটে গেলে পাশে সার বাঁধা ঘর। আলোয় আলো চতুর্দিক। ভগ্নপ্রায় বাড়ির দ্বিতলে ঝুল বারান্দায় ভাঙা ভাঙা কাটের পাটাতন। সাথে রেলিঙের উপর পুরু ধূলোর স্তরের মাঝে লিকলিকে সাপের মত শ্যাপ গ্রিন রঙ এর একরকম লতা। ফুল ফুটে আছে। বা ফুটছে। ঘরের দরজায় গেলাম। জানি উপরে আরো কয়েকটা ফ্লোর আছে। জামাকাপড় ভারী লাগতে শুরু করেছে। শিশুর মত এগোচ্ছি। কাপড় জামা আলগা হয়ে এল। ছোটবেলায় হামাগুড়ি দিয়েছি অনেক। বড় বয়সেও হামাগুড়ি দিতাম মায়ের সাথে খাবার সময় খেলা করতে করতে। শিশু হতে গেলে তার বহিঃপ্রকাশও দেখাতে হয়। আমি সেই শিশু। আমি কি থেকে পালাতে চাইছি? আর কে-ই বা আমাকে ধরে আনবে সেটার কাছে?

দরজা খোলা ছিল। ভিতরে একজন অত্যন্ত অল্প বয়স্ক শিশু খেলে বেড়াচ্ছে। আমারই মত। এইই কি আমাকে ডেকেছিল? কিন্তু সে স্বর যে একজন বৃদ্ধের ছিল! এই শিশুর রূপ বর্ণনা করা যায় না। ত্বকের রঙ ভাষায় আসে না। দৃষ্টির ভাষা দূর থেকে আসা দুর্বোধ্য শব্দের মত মনে হয়। দুহাত ফাঁকা। তবু যেন কি একটা খেলা খেলছে বাতাস নিয়ে। নাকি অন্য কিছু আছে সেই হাতের ফাঁকে? অদৃশ্য কিছু...? না। জানিনা। আমি এগিয়ে যেতে শিশুটাও পালিয়ে গেল পিছনের দরজা দিয়ে। আমি হামাগুড়ি দিয়ে পিছু নিলাম। মুখ দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না। এখনও তো কথা বলা শিখিনি। উঠতে পারছি না দু পায়ে ভর করে। হাঁটতেও শিখিনি তো। কোনো উষ্ণতা বা শীত অনুভূত হচ্ছিল না। যেন আমিই পরিবেশ, তাই তার সাথে আমার ফারাক নেই কোনো।

শিশুটা একটা মেঘে মিশে থাকা সিঁড়ি বেয়ে অক্লেশে হামাগুড়ি দিয়ে বেয়ে উঠে কোথায় মিলিয়ে গেল। সিঁড়ির ধাপে হাত রাখলাম। ভাসমান সিঁড়ি। আমারও তো ভার নেই। উঠতে থাকলাম বিনা বাধায় - হাওয়ায় ভর করে। নিজেকে আর দেখা যাচ্ছে না, বদলে আলো দেখতে পাচ্ছি সারা শরীরময়। কিসের শব্দ নাকি কিসের আলো নাকি কিসের স্পর্শ! কি জানি। কোনো বোধ নেই কোনো বুদ্ধি নেই। শুধু মন্ত্রমুগ্ধের মত চলা।

শেষ সিঁড়ি পার হতেই মেঘ নাকি কুয়াশা কি জানি সরে গেল। সামনে অনন্ত শূন্য। নাকি সামনে সব কিছুই। ইচ্ছে বলে কিছু ছিল না তবু দেখছিলাম সব কিছুই। দেখতে চাইছিলাম বলাই ভাল। এক মহা যোনী এক প্রান্তে, অপরপ্রান্তে অগ্নিকুণ্ড। সমস্ত কিছুই ভেসে চলেছে ধারায়। তাতে কি নেই, আলো আছে, বস্তু আছে, মায়া আছে, অনুভূতি আছে, নিয়ম আছে, বিজ্ঞান আছে, আছে আরো সব কিছু অব্যক্ত।

এই বুঝি স্বর্গ!

পিছন ফিরে তাকালাম, ভাসমান সিঁড়িটা নেই আর। কিন্তু আমার বোধ হয় ইচ্ছে হল তোমাকে এইসব দেখাই। সিঁড়িটা আবার প্রকট হল। খাড়াই উতরাই। তবে নামতে আমার ভয় নেই, উঠতে,যেমন লাগে।

সেদিন ফিরে এসেছিলাম শুধু তোমাকে দেখব বলে, তোমাকেও ওইসব দেখাবো বলে। কিন্তু তুমি কি পারবে পৌঁছোতে? এ সিঁড়ির অস্তিত্ব কোথায়? ত্রিমাত্রিক বাস্তবে নাকি অন্য কোনো মাত্রায়? নাকি মনে? তবু যাবো। খুঁজব সেই সিঁড়ি। একাকীত্বে সুখ নেই। যাবে তো তুমি? যাবে তো?...

আপেক্ষিক


ঘরটায় কোনোক্রমে ঢুকে দরজাটা পিঠ দিয়ে চেপে দাঁড়াল স্বস্তিক। বাঁ হাতে খিলটা তুলতে তুলতে ঘরের ভেতরটা জরিপ করে নিচ্ছিল ও। এই প্রথম দেখছে তো। সিনেমায় সাধারণত যেমন দেখে এসেছে এ ঘর তেমন না। ঘরটা একটু ছোট খুপরি গোছের, অন্ধকার অন্ধকার মত। শুধু লাল রঙের নাইট ল্যাম্পটা মেলে। বিছানা সর্বস্ব ঘরে খাটের পাশে একটা আধ ভাঙা আলমারি আর একটা গোল টেবিলে ছড়ানো সাজের জিনসপত্র। টেবিলের পিছনে দেয়ালে ঝোলানো বড় আয়না। ছোট ছোট দুটো জানলা আছে দুই দেয়ালে, সেগুলো বন্ধ। বাইরে বাজি ফাটছে। সামনে দেওয়ালী - কেউ হউত বাজীর শব্দ পরীক্ষা করছে। কিন্তু সে শব্দ ভেতরে বড় একটা আসছে না। দেয়াল গুলো বেশ মোটা।
খিলটা হাল্কা করে তুলে দিয়ে স্বস্তিক এগিয়ে এল বিছানার সামনে। বুকের ভেতর দামামার আওয়াজ - এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা - বলে বোঝানোর মত নয়।
বিছানায় ফিল্মি কায়দায় একটা পা মেলে আর একটা পা ভাঁজ করে দু হাতে জড়িয়ে হাঁটুতে মাথা রেখে একটা বছর কুড়ির মেয়ে বসে আছে। পরনে শরীর ঢাকা সালোয়ার-কামিজ, সাথে মাথায় ঢাকা ফিনফিনে চেলি ওড়না। শ্যাম্পুকরা ফোলা চুলের গোছা পিঠময় ছড়ানো।
অল্প আলোয় কাছে এসে তবেই বোঝা গেল মেয়েটা চেয়ে আছে আর তার দিকেই দেখছে। স্বস্তিকের গুড়গুড়ুনিটা এবার ওলট পালট হতে শুরু করল। এরকম ভাবে এর আগে কখনও এত কাছ থেকে কোনো যুবতী মেয়েকে এরকম দৃষ্টিতে ও দেখেনি আর মেয়েটা পালটা দৃষ্টিতে চেয়ে আছে - সেটা আরো আশ্চর্যের।
বোধ হয় বেশ খানিকক্ষণ ওভাবেই দাঁড়িয়ে ছিল ও। মেয়েটা পাতলা মিষ্টি স্বরে আদর করে বলল, "ভায়া, এসো, কাজ সেরে নাও। গেটে মাসিকে তো কড়কড়ে নোট গুনে দিয়ে এসেছ, এখন কাজ সেরে না নিলে বেরোনোর পর আক্ষেপ হবে।"
হুঁশ পেল স্বস্তিক। বেশ বড় মাপের খদ্দের ও আজ। হাজার টাকা। হাজার টাকার বিনিময়ে এত সুন্দর একটা মেয়ে... কি আশ্চর্য। মেয়েটা এবার মাথা তুলল, "প্রথম এসেছ বুঝি আমাদের পাড়ায়?"
মন্ত্রমুগ্ধের মত স্বস্তিক উপর-নীচ মাথা নাড়ল।
"জানি। রোজেরই একটা না একটা এরকম কাস্টোমার আসে। পিকিউলিয়ার টাইপ। এসে ভোম্বলের মত দাঁড়িয়ে থাকে, নয়ত পাগলের মত যাতা করে হন্তদন্ত পালায়। তখন দেখলে মনে হয় ভয় পেয়ে গেছে।"
"তাই নাকি!" মেয়েটার পাশে বসে পড়ল ও। "আমার যেন কেমন ইয়ে লাগছে। কিছু মনে করবেন না।"
পা টা নামাল মেয়েটা। কি অপূর্ব সুন্দরী। হাল্কা আলোয় চোখের কোন থেকে নাক ঠোঁট একদম পাথরে খোদাই করা মূর্তির মত। এম্বস করা কাজে যেমন উঁচুনীচু আলোছায়া খেলা করে ঠিক সেইরকম ছায়াগুলো জ্যামিতিক আকার নিয়ে খেলতে শুরু করল। মেয়েটা খিল খিল করে হাসল। "আপনি আজ্ঞে? দাদা পারো বটে। প্রথম প্রথম অনেকেই আসে, কিন্তু এমন কথা কেও বলে না।"
হাসিতে বোধ হয় হাওয়াটা সচল হল। স্বস্তিকও একটু হেসে বলল, "তুমিও তো দাদা বললে, এটাও কি বে-আইনি সম্বোধন নয়?"
"যে বয়সের লোক আসে সেরকম সম্বোধন। তবে বুড়ো এলে তাদের কাকু বলা ছাড়া উপায় থাকে না। নাহলে আবার ক্ষেপে যায়।"
"বুড়ো আসে তোমার কাছে? আর তুমি... ছিঃ!" স্বস্তিকের নিজের কথা নিজের কাছেই ন্যাকা ন্যাকা ঠেকল। আরে কাস্টোমার যদি বুড়ো হয় তো এরা কি করবে। বুড়োদেরও তো একটা শখ আহ্লাদ থাকে, সেটাও তো মেটানোর প্রয়োজন।
"দাদা, এটা ব্যবসা। যেমন খদ্দেরই আসুক না কেন, তাকে এন্টারটেইন করতে হবে। সেটাই পারফেক্ট বিজনেস পার্সনের লক্ষ্য। তবে দাদা একটা কথা বলি, বুড়োরা কিন্তু একটু বেশি এনার্জাইজড থাকে। কষ্ট দেয় বেশি। আর কাকু গোছের লোকগুলো বড্ড লেজি। আমায় খাটায়। তোমার বয়েস কত?"
"ছাব্বিশ। তোমার?"
"ষোল।" বলে মেয়েটা আবার ঝরঝর করে হেসে দিল।" বয়স নিয়ে কি হবে, দেখছো না, দাদা বলে ডাকলাম। তার মানে ছোটই হব। আর যাই হোক না কেন, টান টান আছি। দেখো হাত দিয়ে দেখো।" মেয়েটা চট করে স্বস্তিকের ডান হাতটা খামচে ধরে বুকের কাছে টেনে নিয়ে গেল। ছোঁয়া লাগতেই বিদ্যুতের মত এক হ্যাঁচকায় স্বস্তিক হাতটা ছাড়িয়ে নিল। তার পরই ভুল বুঝতে পারল। এখানে এসে পড়ার পর এই আচরণ এক্কেবারেই যুক্তিহীন। আসার আগে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনেক সুযোহ পেয়েছে-তখনই মনস্থির করা উচিত ছিল। ব্যাপারটা সহজ করার জন্য মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল, "নামটা জানা যাবে?"
"কি হল, অচ্ছুৎ নাকি আমি? সরে গেলে যে? এ ধরণের আচরণ অত্যন্ত অসম্মানজনক। আধা ঘন্টা সময় কিনে নিয়েছ দাদা, যা চাও করে নাও। যে নামে খুশি ডেকে নাও - রীতা, মিতা, কেটি, টেঁপি, সোনা, শবনম, সাহানা যা খুশি। কিন্তু ওয়েস্ট কোরো না। কাল প্রাইভেটে স্যারের কাছে পরীক্ষা আছে, রাতে পড়তে হবে।"
আশ্চর্য হয়ে গেল এবার স্বস্তিক। "তুমি পড়াশোনাও কর? এ-ও সম্ভব?"
"আবাল নাকি? আমার বয়েসি সবাই এখানে তাই করে। এটা তো পার্ট টাইম জব। আমাদের কি লাইফ নেই নাকি? দাদা, বেশি খুঁচিয়ো না। তাড়াতাড়ি কাজ সেরে কেটে পড়ো।" মেয়েটা এবার চেলিটা নামিয়ে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল। তারপর সুন্দর ভঙ্গিতে উর্ধাঙ্গের পোশাক খুলতে লাগল। স্বস্তিক বাধা দিল না। উলটো দিকে চেয়ে রইল।
"নয় নয় করে হলেও দুবছর আছি এ ব্যবসায়। তোমাদের আর কি, বাবার পয়সা আছে, কিস্যু অভাব অনটন নেই। খাও দাও বাওয়াল করে বেড়াও। আর এভাবে আমাদের কাছে শখ মেটাতে আসো। তা, দাদা, পার্সোনাল লাইফে কি করা হয়?"
"এমবিএ পড়ছি। সপ্তা খানেক হল জব পেয়ে গেছি। ব্যাঙ্গালোরে সেটেলমেন্ট। তো শেষ চটকায় মনে হল, জীবনের কথা তো আর বলা যায়না, যদি আর ওয়েস্টবেঙ্গল এ ফিরতে না পারি... বাঙালী সমস্ত জিনিষেরই টেস্ট করা আছে, শুধু একটা জিনিস বাকি পড়ে গেছিল। চলে এলাম তাই। তুমি কি পড়ছ?"
মেয়েটা একটুক্ষণ চুপ করে থেকে নাক দিয়ে হুঁঃ করে শব্দ করল। বলল, "দাদা, আমাদের মত মেয়েদের পার্সোনাল লাইফ আর ব্যবসা সম্পূর্ণ দুটো হেমিস্ফিয়ারের ব্যাপার। গুলিয়ে ফেললে হয় না। পার্সোনাল লাইফে কি করি না করি সেগুলো মারাত্মক কনফিডেনসিয়াল ব্যাপার। সো, ডোন্ট থিঙ্ক দ্যাট আই অ্যাম গোয়িং টু রিভিল ইট সো ইজিলি। বড় কাস্টোমার হলে না হয় দেখা যাবে, কিন্তু নিউ কাস্টোমারকে? কভি নেহি।"
"তোমার এই লাইফটা ভালো লাগে?" স্বস্তিক চঞ্চল হয়ে উঠল হঠাৎ। বাঁ হাত দিয়ে খাটের মাথার কাছে নকশাগুলোয় বিলি কাটতে কাটতে ঘরময় দৃষ্টি ঘোরাতে লাগল।
"পয়সা, দাদা, পয়সা, এ শরীরে আছেটা কি! তুমি নিতে পারো আর আমি দিতে পারি না?"
"তুমি মিথ্যে বলছ।" স্বস্তিকের কন্ঠস্বর বেশ দৃঢ়।
মেয়েটা পোশাকটা খুলে আবার হাতেই ধরে রইল। মুহুর্তের মধ্যে ঘরের বাতাসটা বদলে গেল। একটা ছটফটানি গোছের নীরব তাণ্ডব যেন চলেছে। বাতির শিখা ধরলে সে তাণ্ডবের নাচ দেখা সম্ভব। প্রায় মিনিটখানেক সব চুপ থাকার পর মেয়েটা উল্টোদিকে চেয়ে জোরে জোরেই বলল, "এরকম ও খদ্দের আছে, শালা সাহস নেই, বাপের পয়সা ওড়াতে চলে আসে। বালের পুরুষত্ব নেই আর মনে মনে বাই।"
স্বস্তিক তক্ষুণিই মনস্থির করে নিল।  উঠে দাঁড়িয়ে মেয়েটার দিকে পিছন ঘুরে কোমরের বেল্টটা আলগা করে জিন্সের হুকটা খুলে ভেতরে হাত ঢোকাল। জাঙ্গিয়ার কোন কুঠুরিতে একটা দু হাজারের নোট ভরা ছিল, সেটা বের করে মেয়েটার ডান হাতের মুঠোটা খুলে হাতে দিয়ে আবার মুঠোটা পাকিয়ে দিল। মেয়েটা মাথা নীচু করেই বসে। বাম হাতের মুঠোয় জামাটা ধরে আছে। "নামটা তো জানা হল না, সে যাই হোক, বোন, তোকে ঠিক মা দূর্গার মত দেখতে। দাদার কাছ থেকে উপহার হিসেবে টাকাটা রাখ, পুজোয় একটা শাড়ী কিনিস। কাঁচা হলুদ রঙের। তোকে মানাবে। আর এ পাড়ায় পারলে কম আসিস।" বেল্টটা বাঁধতে বাঁধতে স্বস্তিক মেয়েটার দিকে ঘুরল। সে মুখ তুলে চাইছে না আর। বাঁ হাতের সালোয়ারটা টেনে বুকের কাছে ধরে আছে লজ্জা আড়াল করার জন্য। স্বস্তিক ওর মুখটা দুহাতে ধরে কপালে একটা স্নেহের চুমু দিল, "আসি রে। নিচে বারান্দায় একজন বন্ধু বসে আছে। তাকে আবার বানিয়ে গল্প শোনাতে হবে।"
খিল খুলে যখন স্বস্তিক বেরিয়ে যাচ্ছে তখন একবার আবার ঘুরে চাইল। মেয়েটা দুহাতে সালোয়ারটা টেনে দাদার কাছে লজ্জা ঢেকে রেখেছে। পাথরের ভাষ্কর্য থেকে টপ করে এক ফোঁটা জল পড়ে লাল আলোয় মিলিয়ে গেল।

ঘরে ফেরা

৩০ জুলাই - রাত ১২.১৬
এসইউভি টা অনেকক্ষণ থেকে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার একদম ধার ঘেঁষে। চওড়া হাইওয়ের শুনশান দুপুরটা কটকটে রোদ্দুরে এক্কেবারে চুলোর মত জ্বালাদায়ক। মাঝে মাঝে উড়ো মেঘের আশীর্বাদে বোধ করি রাস্তাটা নিঃশ্বাস ফেলছিল শোঁ শোঁ করে। নিঃসাড় হাইওয়েতে কোনো শব্দই নেই তাই গাড়ির ভেতরের চলমান এসিটার ও শব্দ শোনা যায়। ড্রাইভার সীটের কালো কাঁচটা অল্প করে নামিয়ে পথিক একটা ইম্পোর্টেড সিগারেট ধরাল অন্যমনস্কভাবে। একদৃষ্টে রাস্তার ওপারে চেয়ে আছে।

রাস্তার অপর পারে একটা খাল পেরিয়ে বেশ বড় একটা জমি অ্যাকোয়ার করা হয়েছে। বড় বড় করে গর্ত খুলে খুলে মাপা দূরত্ব বরাবর পিলার বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। মাটিতে ঘুঁটে দেবার মত করে এদিক ওদিক এখন ও জোলো বনকচু আর ঘেঁটু গাছের জঙ্গল রয়ে গেছে। সপ্তাহ তিনেকের মত সময় ধরে কনস্ট্রাকশনের কাজ একদমই বন্ধ হয়ে পড়ে আছে বিশেষ কারণ বশত। তাই ভেতরে জনমানব নেই। ঢোকার মুখে একজন গার্ডের বসে পাহারা দেওয়ার কথা, যদিও এখান থেকে তাকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে ন। পুরো এলাকাটা এমনিতে ঘন করে কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা, তাই ভেতরে মানুষ - মায় কুকুর-ছাগল পর্যন্ত ঢুকতে পারার কথা না। তবু, ভেতরে দুটো কুকুরছানা খেলা করার ভঙ্গিতে লাফিয়ে বেড়াচ্ছিল।
আশ্চর্য! কুকুরছানাগুলো ঢুকল কেমন করে? পথিকৃৎ মজুমদার গাড়ির দরজা খুলে নেমে দাঁড়াল রাস্তায়। সাদা পেপে জিন্সের টিশার্টের সাথে কার্গো জিন্স, চোখে ওয়েফারার গ্লাস। সিগারেটটা ফেলে দিয়ে চট করে রাস্তা পার করে নিল সে। খাল পেরিয়ে সামনেই একটা প্রকাণ্ড শিমুল গাছ। গাছের পিছনেই চওড়া একটা টেম্পোরারি কাঁটাতারের দরজা। তার পাশেই সাইনবোর্ড - মজুমদার ইন্ডাস্ট্রিজ। আন্ডার কন্সট্রাকশান। গাছের নরম ছায়ার নীচে প্লাস্টিকের চেয়ারটা ফাঁকা। গার্ড বাবাজি হাওয়া। অদূরেই খান্না মেশিনারিজের একটা নতুন প্রোডাকশান সেন্টার চালু হয়েছে। সেখানে এলাকাটা একটু জমজমাট। দুপুরে ওখানে লরি ড্রাইভার গুলো লাঞ্চ সেরে ছাউনিতে বসে তাস পেটে। নির্ঘাৎ সেখানেই গিয়ে বসে আছে। যাক গে। গাড়িটা লক করে এসেছে কি না ভেবে নিয়ে পথিক জিন্সের ছোট পকেট থেকে একটা চাবি বের করল আর ছোট সাইড-দরজাটা খুলে ঢুকে পড়ল।
ভেতরে এদিক ওদিক বালির ঢিবি - ইটের লাট - স্টোনচিপের ডাঁই। বেশ একটা ভুলভুলাইয়া গোছের জায়গা এই ঢোকার মুখটা। এখানে সব জায়গায় ফোনে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। পশ্চিমের দ্বিতীয় পিলারের সামনে দাঁড়ালে একদম সিগন্যাল থাকে না। সেখানেই পথিক একটা কাটা গোলঞ্চ গাছের গুঁড়ির ওপর বসে পড়ল, হাতের ক্যারিব্যাগটা নামিয়ে রাখল পায়ের কাছে। মনটা আজ ওর ঠিক ভাল নেই। গত কয়েকমাস ধরেই এরকম হঠাৎ হঠাৎ অনুভব হচ্ছে ওর। ঠিক কি হচ্ছে বা কেন হচ্ছে তা ওর নিজের পক্ষেই গুছিয়ে বুঝে ওঠা অসম্ভব। হঠাৎ করে মনে হয় পারিপার্শ্বিক সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে খুব শিগগির অন্য কোনো জীবনে ঢুকে পড়ে সময়টা বদলে ফেলা অত্যন্ত প্রয়োজন। জটিলতা কাটিয়ে একটা শিশুসুলভ জীবন - যে জীবন সহজ-সরল-বন্ধুবৎসল। যেখানে মানুষ ওকে টাকায় চিনবে না, চিনবে নাম ধরে। এক ডাকে যেখানে কেউ ছুটে চলে আসবে একলা লাগা রাতের ছাদে। কথা বলার মত কেউ বা সাথে মারামারি করার মত একটা কেউ। একটা শুকনো গোলঞ্চ ফুল একটা সরু ডালে লেগে ছিল। ফোন চেক করল - নেট ওয়ার্ক ফাঁকা। তারপর ফুলটা তুলে তার ওপর ফোনটা রাখল সে।
দুপুর গড়িয়ে তিনটে বেজেছে। পেট ক্ষিধেয় চুঁই চুঁই। অথচ সাথে তেমন কিছুই খাবার মত নেই। ক্যারি ব্যাগে বাঁধা আছে পার্সেল্ড চিকেন টিক্কা আর রুমালি রুটি। তাতে মন লাগছে না। মনের এখন খেলার সময়। স্মৃতির এডাল ও ডাল ঘুরে মন ভরানোর সময়। চট  করে তাই স্কুলবেলার একটা কথা মনে পড়ে গেল।
বেবিসিটার স্বপ্না আন্টি একরকম পারমানেন্টই হয়ে গেছে তখন এই বাড়িতে। পথিকের দেখভালের বেশ কিছুটা দায়িত্ব নেয়া, স্কুলে পৌঁছে দেয়া এইসব। মা তখনও বেঁচে আছেন। বাড়ির রান্নাটুকু মা-ই করত। প্রত্যেক দিন ঘড়ি ধরে ঠিক সাড়ে ছ'টার মধ্যে ব্রেকফাস্ট রেডি। ব্রেকফাস্ট করে উঠতে না উঠতেই হাতে পেয়ে যেত লাঞ্চবক্স। মায়ের জীবনে কোনো আড়ম্বর ছিল না। ভোরে উঠে স্নান সেরে পুজো ঘর। তার পর রান্না ঘর, তারপর ঘর পরিস্কারের কাজ সেরে ডান্স স্কুল আর সেখান থেকে ফিরে ব্যবসার অফিশিয়াল কাজ কাম দেখে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সাতটা আটটা এমনিই বেজে যেত। ব্যবসার অনেকটা কাজ দেখাশোনা করলেও মায়ের কোনো পার্টি ফার্টিতে যাবার অভ্যাস ছিল না। সেদিন পথিক কে পিক আপ করতে এল মা। গাড়িতে উঠে সীট বেল্ট বেঁধেই মা দেখে নিয়েছে পথিকের সাথে লাঞ্চবক্সটা নেই। জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারল যে যাবার পথে কোথায় পড়ে গেছে মনে করতে পারছে না। দুপুরে লাঞ্চ হয়নি। ভীষণ বকুনি খেয়েছিল তারপর গাড়িতে ফিরতে ফিরতে। তাই নয়, আবার পথে শুগার এণ্ড স্পাইসে গাড়ি দাঁড় করিয়ে কেক কিনিয়েছিল। ক্ষিদের মুখে ও-ইই সব। দাঁড়িয়েই ওই অবস্থায় একটা খেয়ে নিয়েছিল পথিক।  ফের গাড়িতে ওঠার পর মা এক্কেবারে চুপ। চকোলেট কেকে কামড় বসাতে বসাতে পথিক লক্ষ্য করেছিল মায়ের চোখের কোনে জল। কি কারণে, ভেবে বুঝতে পারেনি ওই বয়সে। ডাইভার্সানের জন্য মা মিউজিক সিস্টেমটা চালু করে দিয়েছিল। এফ এম - তখন সবে কোলকাতায় এফ এম চ্যানেল গুলো চোখ মেলতে শুরু করেছে।
টুং। ফোনে আওয়াজটা শুনে বোঝা গেল নেটওয়ার্ক এসেছে এবং হোয়াটস্যাপে কেউ ডাক দিয়েছে। অরিজিৎ-পার্থ-অয়ন যে কেউ হবে। সাড়ে চারটেয় ক্লাবে যেতে বলবে। অমুক তমুক ফিরস্তি। অন্য সময় হলে ফোনটা চেক করত, এখন পড়েই রইল। পেটে ক্ষিধে, মনে মিছিমিছি শুগার এণ্ড স্পাইস। না, শুগার এণ্ড স্পাইস নয়, ওটা মায়ের আদর। চার বছর হল ঝাল-মিষ্টির স্বাদ পায়নি পথিক। পাবেও না আর। মায়ের পর ব্যবসার দায়ভার গিয়ে মেসোমশায়ের হাতে পড়ে। রান্নার দায়ভার পড়ে স্বপ্না আন্টির ওপর আর পথিকের হাতে পড়ে টাকা। ল-ইয়ার আঙ্কল মাঝে মাঝে এসে কাজ টাজ বুঝিয়ে দিয়ে যেতেন - ব্যাস ওই টুকুই।
একটু সমঝদার হবার পর নতুন ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান করল মেসোমশাইয়ের সাথে - বছর দুয়েক আগে। আর তার পর থেকেই এই অদ্ভুত রোগে পেয়েছে ওকে। সেকেন্ড ইয়ারের সায়েন্সের স্টুডেন্ট পথিক। ফার্স্ট ইয়ারে অল্প আধটু কলেজ গেলেও এখন আর একদম কলেজ অ্যাটেণ্ করে না। বন্ধুগুলোই আসলে কেউ সুবিধের না। বাবা মা না থাকার কারণে এই বয়সেই চোখ একটু বেশি খোলা থাকে পথিকৃতের। মানুষ চেনে ভাল। তাই কলেজ যায় না বড় একটা। মাঝে মাঝে মায়ের শেলফের বইগুলো খুলে খুলে দেখে। পড়ে না, খোঁজে। ছবি খোঁজে। মাকে চেনার অনেক বাকি রয়ে গেছে। পুরানো কোনো ছবি যদি হুট করে বেরিয়ে আসে আর তাহলে যদি আর একটু চেনা যায়...। ছবি পায়নি, একটা রিপোর্ট পেয়েছিল। বাবার মেডিকাল টেস্টের রিপোর্ট। ইন্টারনাল ব্লাড ক্লটিং থেকে সেরিব্রাল স্ট্রোক - তবু সারভাইভালের পসিবিলিটিজ ছিল। এমনই লেখা ছিল রিপোর্টে। রিপোর্টটা বাবার ছুটি হয়ে যাবার দুসপ্তাহ আগের। মায়ের কাছে এটাই ছিল শেষ ভরসা। হয়ত এটা খুলে খুলে দেখত আর ভাবত বাবা সেরে উঠবে। মায়ের আরেকটা ইউনিকনেস ছিল। আদরের নাম ডাক - বিট্টু! এই নামে শুধু মা-ই ডাকত ওকে।
একদিকের ফরসা গাল রোদে লাল হয়ে উঠেছে। অন্যমনস্কভাবে গালে একটা হাত চালিয়ে নিয়ে দেখল বাদামী রঙের একটা কুকুরছানা সামনে এসে পড়েছে। টলটলে পায়ে এদিক সেদিক লাফাচ্ছে কিন্তু শব্দ করছে না আর কাছেও আসছে না। ছানাটার শরীরটা কিঞ্চিৎ শীর্ণ, কান গুলো নোয়ানো, চোখ গুলো গভীর। পথিকের মায়া লাগল। বেচারা ছানাটা ভেতরে হয়ত ঢুকে পড়েছে, আর বের হতে পারেনি। ক'দিন না খেয়ে আছে কে জানে। ক্যারিব্যাগ থেকে চিকেন টিক্কার প্যাকেটটা বের করে এক টুকরো ছুঁড়ে দিল, যদি খায়। ছানাটা মুখ নিয়ে গিয়ে শুঁকল দুবার, আর তার পর টিলটিলে পায়ে কোথায় স্টোনচিপের ঢিবির পেছনে উধাও হয়ে গেল। আশ্চর্য কিউট এই বাচ্চাটা। পথিককে বেশ টেনেছে। খাবারের প্যাকেটটা নিয়ে ও উঠে পড়ল। দুটো টিলা পেরোতেই সামনের ইটের পাঁজার পেছনে বাচ্চাটা উঁকি দিচ্ছে। সাথে আরো একটা - দ্বিতীয়টা পুরোপুরি কালো।
আর দুপা এগোতেই যেটা দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল, সেটার জন্য পথিক এক্কেবারে প্রস্তুত ছিল না। ছেঁড়াফাটা ত্রিপলে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ইটের পাঁজার সাথে মিলিয়ে বানানো একটা টেম্পোরারি তাঁবু। পাশে এদিক ওদিক ছড়ানো ভাঙাচোরা ব্যবহার সামগ্রী আর কাপড়। প্রমাদ গুণল পথিক - এলাকাটা ভাল না, চোর-ডাকাতের উৎপাত লেগেই থাকে, সাথে খুন ও। কোথায়া কে খুন হয় আর হাইওয়ের ধারে নালায় বনে ঝোপে লাশ ফেলে দিয়ে যায়। দেখার লোক নেই। গতকালই একটা ন'-দশবছরের বাচ্চা মেয়ের লাশ খান্না মেশিনারিজের ওদিকে কোথায় পাওয়া গেছে। শোনা গেছে রক্তারক্তি কেস। বাকিটা পুলিশ জানে। এরকম এলাকায় একটা ব্যক্তিগত জমির মধ্যে লুকিয়ে তাঁবু ফেলাটা আশ্চর্যের। গার্ড বাবাজির কপাল খারাপ। বেশ কিছুটা কৈফিয়ত দিতে হবে আর ধমক ও খেতে হবে মেসোমশাইয়ের কাছে। নিঃশব্দে পা ফেলে তাঁবুর মুখের কাছে গেল পথিক। এবার দ্বিতীয় চমক। অত্যন্ত ছোট পাতা একটা সংসারের মধ্যে অগোছালো শুয়ে ঘুমিয়ে আছে একটা বছর চারেকের নরম শিশু। কন্সট্রাকশানের কাজ বন্ধ আছে আজ বাইশ দিন - তাঁবুটা দুসপ্তাহ আগেও পাতা হয়ে থাকতে পারে। কুকুরছানাগুলো পিছন দিক থেকে দৌড়ে এসে এবার পথিকের পায়ের ফাঁকে গলে বাচ্চাটার কাছে গিয়ে ডাকতে শুরু করল। পথিকও মুখ খুলল, 'এই কে রে তুই?'
বাচ্ছাটা ঘুমিয়েই আছে। কোনো সাড়া নেই। আর দুবার ডাকার পরেও সেই একই অবস্থায় - নড়ছেনা। পথিকের সন্দেহ হল। কাছে যেতে ভয় হচ্ছিল, তবু উপায় নেই দেখে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। ফোনে ঘড়ি দেখল - আর ক্যামেরাটা খুলে দুটো ছবি তুলল। পার্থ আর অয়নকে ছবিগুলো সেণ্ড করতে গিয়ে দেখে আবার নো নেট ওয়ার্ক কভারেজ অবস্থা। ফোনটা এবার সে ঢুকিয়ে রাখল। গুঁড়ি মেরে ছোট্ট তাঁবুতে ঢুকে বাচ্চাটার কপালে হাত দিয়ে দেখল। ভেবেছিল ঠাণ্ডা হবে। তা নয়, গরম আছে। ঝড়ের মত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল পথিক। আবার হাত দিল কপালে। শুধু গরমই নয়, বেজায় গরম। জ্বরের ঘোরে অজ্ঞান হয়ে থাকতে পারে। আর দুচার বার তাকে ঠেলা দিতে বাচ্ছাটা একটু নড়ল। এবার ক্যারিব্যাগ থেকে জল বের করে পথিক আছড়া দিল বার দুয়েক। জল দিয়ে মুখটা মুছিয়েও দিল।  কে জানে কোন অবস্থায় এর পরিবার পরিজন একে ফেলে রেখে গেছে। বাচ্ছা ছেলে - খাবারই বা পাবে কি করে আর থাকবেই বা কার কাছে। কুকুরের ছানাগুলো এক্কেবারে ভেতরের কোনে ঢুকে গুঁড়ি মেরে বসে আছে। ছেলেটাকে পথিক কোলে তুলে বাইরে বের করে আনল। ছেঁড়া মাদুরটা বিছিয়ে তাতে শুইয়ে দিয়েছে ত্রিপলের হাল্কা ছায়ায়। জল দিয়ে ভাল করে কপালে মুছিয়ে হাত বোলানোতে মিনিট দুয়েক পর বাচ্ছাটার জ্ঞান হল। তোতলা স্বরে ডেকে উঠল, 'দিদি!'
এবার পথিক দুহাতে বাচ্ছাটাকে ধরে ঝাঁকাল, 'এই, এই, কে তুই, ওঠ শিগগিরি!' জ্ঞান হওয়া দরকার। মনে হয় ডিহাইড্রেশান হয়ে গেছে। উঁকি মেরে তাঁবুর ভেতরে দেখল, কোথাও একবিন্দু খাবারের চিহ্ন নেই। বাচ্ছাটা চোখ মেলে পথিককে দেখছে, 'দিদি কই?'
'কে দিদি? নে, জলটা খা।' বোতলের ছিপিতে করে কয়েকবার অত্যন্ত যত্নে ও বাচ্ছাটাকে জল খাওয়াল। উঠে বসছেনা বাচ্ছাটা। মনে হয় দুর্বল হয়ে আছে। খাবার দেবে কি? ব্যাগে আছে চিকেন টিক্কা আর রুমালী রুটি। ঝটপট বের করে আনল খাবারগুলো। আকাশে এই মুহুর্তটা বড় একখণ্ড মেঘ টেনেছে। রোদটা ঢেকে গেছে - ঈশ্বরের অসীম দয়া।...
*******************
সন্ধ্যে সাড়ে ছটা বাজে। ক্লাবঘরের দোতলায় বড় একটা কেউ ওঠেনা। দোতলার পশ্চিমের ঘরের বিছানায় বাচ্ছাটা শুয়ে আছে। পার্থ, অয়ন, অরিজিৎ আর ভিক্টরকে নিয়ে বসে আছে পথিক। একদফা ডাক্তার দেখে গেছে এর মধ্যেই। থানাতেও খবর গেছে কিছুক্ষণ আগে - পুলিশ এসে পড়ল বলে। বাচ্ছাটা এতক্ষণে যা বলেছে তাতে জানা গেছে দিদিকে নিয়ে এক সপ্তাহ আগে এসে পথিকদের কন্সটাকশান সাইটে কোনোক্রমে ঢুকে ঘর বানিয়েছিল ওরা। দিদিই দেখ-ভাল করত। ভিক্ষে করত মনে হয়। বিকালে ফিরে আসত খাবার দাবার আর কাঠকুটো নিয়ে। রাত্রে জ্বেলে রাখত প্রয়োজনে। কুকুরছানাগুলোও এখানেই পায় ওরা। কদিন থাকার পর সব অভ্যাস হয়ে যায়। দিদি সকালে বেরিয়ে যায় আর সন্ধ্যায় ফেরে খাবার দাবার নিয়ে। কিন্তু গত পরশু আর ফেরেনি।
ওর মাথায় চট করে এসে যায় বাচ্ছা মেয়ে খুনের ব্যাপারটা। বয়স ও মিলে যায় - গল্পটা শুনে সেই মেয়েটাই মনে হয়। ব্যাপারটা জানানো হয়না বাচ্ছাটাকে।

পৌনে সাতটা বাজে। পশ্চিমের জানালায় নারকেল গাছের মাথায় বেগুনি আকাশ। কুকুরছানাগুলো পথিকের পায়ে এসে মুখ ঘষতে শুরু করেছে এবার। পথিক পা সরিয়ে নেয় না। তাঁবুতে থাকার সময় রুমালি রুটির দুটো ছাল খেয়েছিল ছানাগুলো। এখন ও বোধ হয় দুধেরই বয়স। তাই খাবারে মুখ দেয় না বড় একটা।
অনেকক্ষণ কথাবার্তা চলার পর বাচ্ছাটাকে কাছাকাছি কোনো হোমে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হল। পথিকের ব্যাপারটা মনোমত হচ্ছিল না, তবুও সে ধীরে ধীরে নিমরাজি হল।
এবারের দৃশ্যটা বেশ আলাদা। সবাই বেরিয়ে যাবার পরেও পথিক বসেই আছে খাটে - শিশুটার পাশে। অদ্ভুত তৃপ্তিতে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর দ্বিগুণ তৃপ্তিতে  চোখ বুজে আছে বাচ্ছাটা। জ্বরটা এখন ও নামেনি।
মনের মধ্যে ভাবনার একটা মৃদু ছটফটানি লক্ষ্য করছিল পথিক। অনেকদিন এমন মনে হয়নি। বাচ্ছাটার মধ্যে একটা কি টান আছে। এ টান অনেকদিন অনুভব করেনি ও। একটা ভিন্ন জীবনের টান - একটা ফুটফুটে স্বপ্ন - যেটা কতদিন দেখেনি সে।

পুলিশের কাজকর্ম মেটার পর পুলিশকর্তা বলেছিলেন, 'বাচ্ছাটাকে খুব শিগগিরই কোনো হোমে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করতে হবে।' পথিক চোখে হেসে বলেছিল, 'হোম, স্যার ঠিকই বলেছেন। হোম। বাচ্ছাটার ঘরে ফেরার বড় দরকার।' গাড়িতে এসে বসেছিল পথিক। পাশের সিটে বাচ্ছাটা আর পেছনের সিটে কুকুরছানা গুলো। তখন বেশ স্পষ্টই সন্ধ্যে নেমেছে। সিটবেল্টটা বেঁধে দিয়ে চাবি ঘুরিয়ে স্টার্ট দিতে দিতেই আকাশের তারাদের মধ্যে থেকে একটা তারা পথিককে উদ্দেশ্য করে আকাশবানী শুনিয়েছিল, 'বাচ্ছাটার সত্যিই একটা পরিবারের বড্ড প্রয়োজন। আর তার থেকেও বেশি প্রয়োজন তোর, বিট্টু।'
প্রাক্তন(s)

সৌরেন্দ্র নাথ কুণ্ডু




আমার বাড়ি ফেরার তাড়া,



আমার ইচ্ছে লাগাম ছাড়া,



আমারা হার্ট অ্যাটাকের "কিওর"গুলো কই...



আমার ফোকলা পকেট ভারি,



আমার গাল ফোলানো দাড়ি,



আমার বন্ধু-স্বজন একলা সাইকেলই।




আমার হঠাৎ বিকেল গুলো



আমার "শব্দকল্প" গুলো



এখন গলার ভেতর বুজগুড়ি খায় জমে।



কারো "হঠাৎ বিকেল" পেলেও



এখন যাচ্ছে আমায় ভুলে।



আমার সময় জ্বলছে আগুনলাগা মোমে।



জিভের আনাচে কানাচে



আমার মুদ্রা দোষ-ও আছে।



আমার বুকের বাঁয়ে হৃদয়,তবু বড়।



আমার ফোকলা পকেট ভারি,



আমার স্বভাব-ও আনাড়ি,


আমাকে "ঘেন্না করো, ঘেন্না করো।"

---------------------------------------------------------------------------------
09-09-2016, 9.45PM

দুর্যোগে যোগ

-।। দুর্যোগে যোগ ।।-
পুকুরের ওপারে তাকালে সার সার তালগাছ গুলোর মাথায় তুঁত-কালো চাঁদোয়ার মত ঘন পুরুষ্টু মেঘটা চোখ ঠারায়। পাশে দাঁড়করানো সাইকেলের ক্যারিয়ারে বাজারের ব্যাগটা বসিয়ে ফোনটা নিয়ে টুকটাক ঘাঁটতে ঘাঁটতে অভ্র ক্রসলেগড হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ভরা বাজারের রাস্তার এক কোনে। মোড়ের মাথা থেকে একটু ভেতরে ঢুকলেই অভ্রদের স্টেশনারি স্টপের হোর্ডিংটা চোখে পড়ে। কিন্তু ওদিকে এখন তাকানোর যো নেই। এখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে তাকে যতক্ষণ না সঠিক সময় উপস্থিত হয়। মাথায় বুঝি আজ ভুত চেপেছে। নাহলে এরকম ক্ষ্যাপামি কেউ করে? হয়ত করে, তা বলে এরকম বাজারের রাস্তায়? ওপাশে পুকুর পাড়ে আইস্ক্রিম-কোল্ডড্রিঙ্কসের স্টোরটা থেকে রমেশ কাকা মাঝে মাঝেই চশমার উপর দিয়ে ট্যারা চোখে তাকাচ্ছে। ভাবখানা এমন, ছেলেটার মতলব টা কি? এরকম ভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকার ছেলে তো এ নয়! এদিকে পিছনে আলু নিয়ে যে মাসিটা বসে আছে সেও অভ্রকে দুবার হুশ হুশ করে সরে যাবার নির্দেশ দিয়েছে। একেই তো রাস্তার উপর দোকান, তার উপর মুখের সামনেটা জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকলে কি করে খদ্দের ঢুকবে। অভ্র তবু কোনো রকমে একপাশে সরে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মনে এদিক ওদিক চিন্তা। মাথার ঠিক নেই এখন। কাল রাতে যা ঘটে গেছে তার পর আর ব্যাপারটা সিরিয়াসলি না নিয়ে যায়ই বা কোথায়। বাঁ হাতে ঘড়িটার দিকে একবার মাত্র চেয়ে আবার ফোনের দিকে লক্ষ্য দিল। সাড়ে এগারোটা বাজে। সময় উপস্থিত। দৃষ্টি ঘুরতে থাকল- একবার ফোনের স্ক্রিন, একবার মোড়ের মুখ।
কাল রাত্রে শুতে বুঝি ১২টা বেজেছিল। অভ্রর ডেইলি রুটিনের স্ট্যাটিস্টিক্স দেখলে এটা "আর্লি টু বেড।" মাইন্ড এমনিতেই লণ্ডভণ্ড ছিল। উটকো চিন্তা আর উড়ো ভাবনায় কাহিল। কাল সোমবার। কাজ হালকা থাকলে একবার ট্রাই নেওয়া যেতেই পারে ভেবে প্ল্যানিং করতে শুরু করল শুয়ে শুয়ে। মেয়েটা সপ্তাহে তিন দিন পড়তে আসে পাশের কোচিং সেন্টারে। কাল আসবে মোটামুটি সাড়ে ন'টা নাগাদ। ফিরবে সাড়ে এগারোটায়। সেই সময় যদি বাজারের মোড়ের কাছে ধরা যায় মেয়েটাকে...। একটু রিস্ক আছে। বাজারের মুখ, দিনের বেলা অত্যন্ত সেন্সিটিভ এলাকা। প্রত্যেকটা লোক ওকে খুব ভাল করে চেনে। ছেলে হিসেবে রেপুটেশন ও খারাপ নয়। অতএব, কোনো কেলোর কীর্তি যাতে না হয় সেদিকে কড়া চাপাচাপি। অনেকেই হয়ত এই সিদ্ধান্তের জন্য অভ্রকে ক্ষ্যাপা বলবে, কিন্তু ওর হাতে আর কোনো অপশনও নেই। কোচিং সেন্টারের মুখটা - যাকে বলে ওপেনিং - ঠিক ওদের স্টোরের সামনেই। বাবা অল টাইম স্টোরে থাকে। অতএব ওখানে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগই নেই। বাবার চোখে পড়লে কি হবে কিছু বলা যায় না। তাই, বাদ। এপাশে মোড় ঘুরে এলেই আর দু-মিনিট হেঁটেই বাসস্ট্যান্ড। অভ্র অনেকবার লক্ষ্য করেছে মেয়েটা বান্ধবীদের সাথে ওদিকে বাসস্ট্যাণ্ডের দিকে চলে যায়। নিশ্চয়ই বাস ধরে বাড়ি ফেরে। এলাকার মেয়ে যে নয়, সেটা দেখেই বোঝা যায়। আশে পাশে মেয়েটাকে কোনোদিন দেখেনি অভ্র। কি আজব! শেষে এই মেয়েটাকেই ভাল লাগল? কত মেয়ে ফেসবুকে 'পিপল ইউ মে নো' কলামে আসে, কিন্তু এই মেয়েটা আসে না কেন? অভ্র তো মেয়েটার চলা, কথা বলার স্টাইল্‌, চওড়া হাসিটা, আড়চোখে তাকানোটা - মুখস্থ করে ফেলেছে। এর পর ও মেয়েটাকে অচেনা ভাবা যায় না। কিন্তু ফেসবুক কি আর সেটা বোঝে? ওই কোচিং সেন্টারে কোনো বন্ধুও নেই যে সমস্ত খবরাখবর বের করে দেবে। আশেপাশে বন্ধুরা সবাই যে-যার নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। যেখানে সবাই চাকরির খোঁজে রাতের ঘুম নষ্ট করছে সেখানে অভ্রেরই বা এরকম হল কেন! মোটামুটি মেয়েটাকে থামাতে পারলে... না না, এই রাস্তায় থামিয়ে কথা বলা সম্ভব না। লোকের চোখ টানবে। তার চেয়ে বরং চলতে চলতে কথা বলাই বেটার। ...মেয়েটাকে মোটামুটি কথা বলতে গেলে কি দিয়ে শুরু করবে তা অভ্রের অনেক দিনেরই ভাবা ছিল। সে হয়ত এটা জানে যে মেয়েটা কোচিং-এ পড়তে আসে। সম্ভবত বি এ ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। কিন্তু মেয়েটার কাছে সে সম্পূর্ণ অচেনা। ইংলিশ খুব ভাল হতে পারে। ইংলিশেই কথা বলা যাবে। মেয়েটাও আর অভ্রকে আওয়ারা মনে করবে না, অভ্রর নিজের দিক থেকেও শিক্ষিত হওয়ার নমুনা দেওয়া হয়ে যাবে। অতএব যা বলবে সে... মাথা গুলোতে থাকল। ভাসা ভাসা দেখা যাচ্ছে যে মেয়েটা আসছে। সাথে দুজন বান্ধবী। অভ্রকে রাস্তায় একধারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেনি বোধহয়। দেখলে কিছু না কিছু রিয়্যাকশান হত। প্রথম দিন যা হয়েছিল...। দুপুরের কোন একটা সময়ে- বোধ হয় ৩টে বাজে। খাঁ খাঁ রোদ। দোকানপাট সব বন্ধ। গরমে যা হয় আর কি। এই সময় মেয়েটা কোচিং থেকে ফেরে। ধরতে পারলে কথা বলা যাবে ভেবেই কোচিং এর ঠিক গেটের সামনে গলিটায় দাঁড়িয়ে রইল ঠায়। এই গরমে এতটা সহ্য করে থাকাটাও বিশেষ স্কিলড পার্সনের পক্ষেই সম্ভব। ভাবলেই ভয় লাগে। রাস্তায় রাস্তায় সানস্ট্রোক হয়ে মৃত্যুর খবর প্রত্যেক দিনের কাগজে লেগেই আছে। প্রায় একঘন্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার পর যখন মেয়েটা একদল বন্ধু বান্ধবের সাথে বেরিয়ে এল তখন হঠাতই অভ্রের স্ট্যামিনা অর্ধেক হয়ে গেল। আর কাছে আসার পর সেই যে অভ্র "এক্সকিউজ মি" বলে ডাক দিয়েছিল, তার পর আর কিছু মনে নেই। তবে এটা মনে পড়ে, সমস্ত বন্ধুদের মাঝে ঘেরাও হয়ে একরকম এসকর্টের ভঙ্গিতে মেয়েটা রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিল। ঠায় দাঁড়িয়ে রয়ে গেছিল অভ্র।
আর একটু কাছে এসে মেয়েগুলো অভ্রের দিকে তাকাল। আজ মেয়েটাকে আর অন্য কিছু ভাবমূর্তিতে দেখা গেল না, বরং অভ্রকে দেখে চোখে প্রশ্ন নিয়ে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল। মনে সাহস এল অভ্রেরকাছাকাছি আসতেই এগিয়ে গেল সাইকেল নিয়ে। কে তাকিয়ে আছে, কে কি ভাবছে সেসব ভাবার সময় নেই। প্রথম কথাটা বলল, 'ডোন্ট প্যানিক। আই ওন্ট ওয়েস্ট মোর দ্যান থ্রি মিনিটস অফ ইওর টাইম। কিপ মুভিং, ডোন্ট স্টপ।' মেয়ে গুলো কথাটা শুনল। অদ্ভুত ভাবে বাকি মেয়ে গুলো একটু পিছিয়ে গিয়ে এবার ওদের দুজনকে এগোতে দিল। কেউ কারোর দিকে চাইছে না। রাস্তার দিকে চেয়ে এগোচ্ছে বাসস্ট্যান্ডের দিকে। অভ্রর আগে মেয়েটাই কথা বলল, 'আপনার নাম শুনলাম। আমার বন্ধুদের কেউ কেউ আপনাকে চেনে। আপনি কি চান বলুন সোজাসুজি।' অভ্রের একদম মুখে কথা রেডি করা ছিল। তক্ষুণি উত্তর দিল, 'ভাল করে যাকে চিনিনা, এমনকি যার নাম পর্যন্ত জানি না, তার কাছ থেকে আর কি চাইব। তবে দেখি আপনাকে এখান দিয়ে যেতে, মনে হল নামটা জিজ্ঞেস করি। তাই...'। -'এইটুকুই! কিন্তু নাম জেনে করবেন টা কি?' -'মানে...' অভ্র একটা অদ্ভুত কথা বলে ফেলল, 'মানে, আপনি মুসলমান নাকি হিন্দু সেটা না জানতে পারলে আর কি করে কিছু বলি বলুন তো!' মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটল, তার পর সরাসরি চোখের দিকে চেয়ে বলল, 'অদ্ভুত তো! মুসলমান কি হিন্দু তাতে কি যায় আসে? আপনি কি আমাকে আই লাভ ইউ বলতে এসেছেন নাকি?' অভ্রের মাথার চাঁদির কাছে কুট কুট করে উঠল। খানিক চুলকিয়ে পিছন দিকে ফিরে দেখল, বাকি বান্ধবীরা মন দিয়ে শুনছে কিন্তু কিছুই বলছে না। যেন ওদের কে সব শেখানো আছে। মনটা শক্ত করে নিল অভ্র। চোখে চেয়ে সরাসরি বলল, 'রাস্তায় চলতে দেখে ভালোবেসে ফেলাটা নেহাত অসম্ভব ব্যাপার। তবে, সেরকমই কিছু তো বটেই। নাহলে আর মিছিমিছি সময় নষ্ট করাব কেন বলুন, তবে যেটা বলতে চাই সেটা হল, এভাবে রাস্তায় যোগাযোগ করা তো সম্ভব না আমার পক্ষে, এটা খুব রিস্কি হয়ে যায়, কাইন্ডলি এটা রাখুন।' পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে দিল অভ্র, ফোন নাম্বার লেখা আছে আর নীচের নাম লেখা। মেয়েটা নিল হাতে, আর ব্যাগে ভরে দিল। এবার আর জিজ্ঞেস করতে হল না, সে নিজেই বলল, 'আমার নাম রঙ্গিতা। অ্যান্ড আই হ্যাভ আ বয়ফ্রেণ্ড। আপনার আর কি বলার আছে?' মনে মনে হায় হায় করে উঠল অভ্র। তবু বুক চেপে বলল, 'তাতে কি হয়েছে? আমি যেটা করছি সেটা কি অন্যায়? মোটেই না। বাই দ্য ওয়ে, ক্যান ইউ এক্সচেঞ্জ ইওর্স প্লীজ?' -'মানে? কি এক্সচেঞ্জ করব? নাম্বার?' -'হ্যাঁ, অসুবিধা না থাকলে...'। রঙ্গিতা কেমন যেন অন্য চাহনিতে বলল, 'দেখুন মিস্টার, আপনাকে নাম্বার দেবার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। ফালতু স্ক্যাণ্ডাল হবে। তার আগে আপনি প্রুভ করুন দ্যাট ইউ ডিজার্ভ মি।' অভ্রর সন্দেহ হল, বয়ফ্রেণ্ড আছে, অথচ আবার কথায় ঘুরতে ঘুরতে এদিকে আসতে চাইছে, ব্যাপারটা কেমন যেন জটিল। মেয়েদের মন বোঝা খুব কঠিন, বিশেষ করে যখন তারা রহস্য করে তখন। এলোমেলো ভাবতে ভাবতে অভ্র বলে ফেলল, 'কি ভাবে প্রুফ দেব?' -'আপনি বুঝবেন সেটা। আমার কাছে প্রুভড হলেই হল।' সামনেই বাসস্ট্যাণ্ড। এখানে রাস্তা একটু ফাঁকা। আর সময় নেই। ঝটিতি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল অভ্র। মুখে একটা চিউইং গাম ছিল, সেটাকে ঠোঁটের সামনে এনে দাঁতে চেপে ধরল, সোজা রঙ্গিতার দিকে ঘুরে দুই কানের পাশে দুহাতে ধরে একটা ছোট্ট লিপ কিসে চিউইং গামটা ট্রান্সফার করে দিল। ব্যাপারটা এতই অপ্রত্যাশিত আর আনাড়ি আর অদ্ভুত আর অসম্ভব আর... যাই হোক, ব্যাপারটা বুঝে উঠতে উঠতে ঘটনাটা ঘটে গেল বলেই বান্ধবীরা কিছু করার সুযোগ পেল না পেছন থেকে। কথা বলার ফাঁকে রঙ্গিতার ঠোঁটদুটোও কিছু বলার জন্যই বোধহয় ফাঁক হয়ে ছিল। চিউইং গামটা মুখেই চলে গেছিল ওর। থু থু করে ওয়াক ওয়াক করে ফেলে দিতে দিতেই একটা ছোট্ট ধাক্কা দিল অভ্রের বুকে। বন্ধুরা এই এই করে চেঁচিয়ে ওঠার আগেই সম্যক জ্ঞান থেকে আন্দাজ করল, এই মুহুর্তে দুপাশে যথাক্রমে মিষ্টির দোকানের অচিন্ত্যকাকা আর ফাস্ট ফুডের দোকানের রঞ্জিত দা তাকে দেখে ফেলেছে। অন্য কিছু ভাবার আগেই বাঁ গালে একটা থাপ্পড় খেল অভ্র আর ঘুমটা ভেঙ্গে গেল তার।
কি আশ্চর্য, কি ডেসপারেট অবস্থায় গেলে তবে এই রকম স্বপ্ন দেখা যায়। সাবকনশাস মাইণ্ডে কি চলছে সেটা জানতে পেরেই আজ এই তড়িঘড়ি অভ্রের বাজারে এসে দাঁড়িয়ে থাকা। বেশি কিছু না, নামটা জানবে আর ফোন নাম্বারটা চাইবে। এমন কিছু ব্যাপার না।
প্রায় দশ মিনিট আরো পেরিয়ে গেল। মেঘটা এবার একদম মাথায় এসে গেছে রোদের লেশ মাত্র নেই কোথাও। সন্ধ্যা হবার মত মুহুর্ত। বৃষ্টি ভেজা অভ্রের একদমই পছন্দ না। কিন্তু হঠাত দেখল টপ করে ঠিক ব্রহ্মতালুতে একফোঁটা জল পড়ল। ঠিক সেই সময়, ঠিক সেই সময় মেয়েটাকে দেখতে পেল অভ্র। মোড়ের আইস্ক্রিমের দোকানের সামনে টার্ণ নিচ্ছে। আজ একটা কাঁচা সবজেটে রঙের সালোয়ার কামিজ পরেছে সে। পাশে চারজন বান্ধবী, আর একজন বন্ধুও রয়েছে। পাঁচজন, আর ও একা। বুকটা ঢিপ ঢিপ করে উঠল। এমন একটা কোনে দাঁড়িয়েছে যে চট করে দেখা যায় না। মেয়েরা ওকে পেরিয়ে গেল। তখনই সাইকেলটা চাবি লাগিয়ে ব্যাগটা যেমন ছিল রেখে এগোল অভ্র। মনের জোর এমনই, যে একদম এসপার ওসপারের সিদ্ধান্তে অনড়। আটা ময়দা কি সব কেনার ছুতোয় বেরিয়েছিল। সেগুলোতে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে - খেয়ালই হল না। দু-তিন কদম হাঁটতেই ধরে ফেলল দলটকে। একটু মুখ বাড়িয়ে আগের দিনের ঢঙেই বলল, 'এক্সকিউজ মি'। এরই মধ্যে ঠিক সেই মুহুর্তেই কোথায় কাছে একটা বাজ পড়ার শব্দ হল প্রচণ্ড শব্দে। এর পর যেটা ঘটল সেটার জন্য শুধু অভ্র কেন, বাকি পাঁচ জনের কেউই প্রস্তুত ছিল না। মেয়েটা মুখ ঘুরিয়ে অভ্রকে দেখেই 'অ্যা?' বলে কেমন বেসামাল হয়ে পড়ল। ওপাশে একজন বান্ধবী তার বাঁ হাতটা ধরেই ছিল। সে কেমন ভ্যাবাচাকা খেয়ে পিছন দিকে ধরতে গেল কিন্তু তাল সামলাতে পারল না। একজন ছেলে, সে পিছনে ছিল, পিছনেই রয়ে গেল। কেন কে জানে, সে ধরল না। মেয়েটা ধুস করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সটান। কি ঘটেছে বুঝতে বুঝি সবার দু-সেকেন্ড সময় লাগল। বাজার পেরিয়ে আরো দু-কদম এগিয়ে এসেছিল ওরা। ওদিকে বাজারে কে বলে উঠল, 'কি হল রে?' পাশে কোন দোকান ছিল না। বাঁ পাশে পুকুর ঘাট। ডান পাশে আধা খাপছাড়া তৈরি একটা দোকান ঘর, ফাঁকা। সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল এবার মেয়েটার ওপর। পাশের বেঁটে গোছের বান্ধবী বলল, 'এই তিন্নি, তিন্নি? কি হল তোর?' তার গালে আলতো হাত বোলাতে বোলাতে মেয়েটা এবার অভ্রের দিকে চাইল ফ্যালফেলিয়ে। মাথার কাছে বসা মেয়েটা অভ্রকে বুঝি এর আগে দেখতে পায়নি। সে অভ্রের দিকে চেয়েই এই সিরিয়ার অবস্থার মধ্যেও ফিক করে হেসে ফেলল। ব্যাপারটা মোটেই অভ্রের ভাল লাগল না। ছেলেটা এতক্ষণে সম্বিত পেয়েছে। অভ্রের দিকে ফিরে বলল, 'দাদা, কি করলে এটা! মনে হয় অজ্ঞান হয়ে গেছে। জল দাও ওকে।' অভ্র সবার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে পুকুর ঘাটের দিকে ছুটল।
************************************************

এত সকালে অভ্রের ঘুম ভাঙ্গে না, কিন্তু ফোনটা যে বেজেই চলেছে। প্রথম কলটা সাইলেন্ট করে দেবার পর আবার কল আসায় এবার অভ্রকে ধরতেই হল ফোনটা। অচেনা নম্বর। বিছানা থেকে অর্ধেক মাথা তুলে পায়ের কাছে আলমারির কাঁচে মুখটা দেখে নিল অভ্র। একমাথা এলো মেলো চুল। চোখ গুলো ভারি। -'হ্যালো। কে?' ওপার থেকে বয়স্কা নারী কণ্ঠ, 'আপনি কি অভ্র বলছেন?' -'হ্যাঁ, বলছি, আপনি কে... মানে, আমি কার সাথে কথা বলছি?' অভ্রর চটকা ভাংতে শুরু করেছে। -'আমি অনন্যার মা বলছি।' অভ্রের মাথায় ঢুকল না। -'কে অনন্যা?' -'মানে? আমার মেয়েকে উত্যক্ত করলে তুমি, বাজারের মাঝখানে ওই এলাকায় লোক জড়ো করলে তুমি, রিকশ' করে ডাক্তারখানা নিয়ে গিয়ে ওষুধ খাইয়ে বাসে তুলে দিয়ে এলে তুমি, আর এখন বলছ কে অনন্যা? ছোঁড়া, তুমি কি নেশা টেশা করো নাকি?' ঢোক গিলল অভ্র। ঘুমটা একদম ছুটে গেছে। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে। গায়ের চাদর মেঝেয় লুটিয়ে গেল। তাড়াতাড়ি দরজা দিয়ে বারান্দায় বেরিয়ে অভ্র আমতা আমতা করে বলে উঠল, 'না, মানে... আন্টি..., আপনি...'। ওপারে ভারী স্বর আবার, 'বুঝেছ তাহলে।' ফ্যাসফ্যাসে গলায় অভ্র বলল, 'আন্টি, আপনার মেয়ের নামটাই তো আমি জানতাম না আগে। আই অ্যাম স্যরি...। মানে...।' -'এত মানে মানে করার কি আছে? ওর ডাকনাম তিন্নি, স্কুলের নাম অনন্যা।... যাই হোক, শোনো যেটা বলি, 'তুমি আজ সকালেই আটটার মধ্যে আমাদের বাড়ি আসবে। মেয়ের নামই যখন জানো না তখন বাড়িও চেনো না নিশ্চয়ই।' -'না, মানে...'। -'ঠিক আছে ঠিক আছে। মোড়ের ওখানে বাস ধরে জগতবল্লভপুরের মোড়ে নেমে পোড়ো। ওখানে সরকারদের বাড়ি জিজ্ঞেস করলে যে কেউ দেখিয়ে দেবে...'। অভ্রের ভয় হল, প্যাঁদানোর ধান্দা নয় তো? সে রেখে ঢেকে জিজ্ঞেস করেই ফেলল, 'মানে... উদ্দেশ্যটা কি বলতে পারেন আন্টি?' দু সেকেণ্ডের নীরবতার পর ওপাশের স্বর নরম হল, হালকা হাসির সাথে কথা এল, 'ছোকরা, তোমার বাবাকে আমি বেশ ভাল ভাবে চিনি। মেয়ে আমার সেদিন বাজ পড়ার আওয়াজে অজ্ঞান হয়ে গেছিল। তুমি হেল্প করেছ। মেয়ের বন্ধুরাও সব খুলে বলেছে আমাকে। পেটাতে নয়, মিষ্টিমুখ করাতে ডাকছি তোমাকে।'
---------------------------------------------------------
13-June-2016, Afternoon.

ঋতুপর্ণ

আমার ছাদে মেঘ করেছে আজও
 তাকিয়ে আছি একলা তারই দিকে।
 গেছে খাওয়া, সারাদিন এর কাজও
বাদলা চিঠি লিখছ হয়তো কাকে...

এমন দুপুর ঠিক তোমারই বুঝি
আকাশ থেকে লিখবে বৃষ্টি তুমি
থমথমে ভাব- কান্নাকাটির ভোর।
পুকুর জলে - "ঋতুপর্ণ তোর..."
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
৩০-মে-২০১৬; সোমবার। দুপুর।

।। স্বাধীনতা উপলক্ষ্যে ।। 

----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
মার সকাল হয় ঠিক ভোর পাঁচটায়।
যখন প্রথম সূর্যের কিরণটা এসে পড়ে চোখের পাতায়।
উঠে পড়ি শয্যা ছেড়ে।
মর্ণিগ ওয়াক, হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূরে।
শয্যা রইলে পড়ে - থাক, থাক।
আমি স্বাধীন, শয্যার বাঁধন? নিপাত যাক।
কিছু পরেই ব্যাগ কাঁধে দুষ্টু ছেলের ভীড়।
আমাকে দেখে তাদের জিভের গতি অস্থির।
সে যাক।
চলতে হবে অনেক।
অসব কথা দূরে থাক।
দুপুর দুপুর করে এসে পড়ি এক বাজারে।
ছড়িয়ে আছে ভাঙ্গা-হাট এধারে ওধারে।
শেষ আনাজউলির করূণায় কিছু একটা জুটল শেষে।
তুই তখন অফিসে-ক্যাণ্টিনে-রেঁস্তরাঁ-ডাইনিং এর মজলিশে।
আমি কিন্তু স্বাধীন।
চললাম, সন্ধ্যের খোঁজে - ধোঁয়াটে রাস্তার লেজ ধরে।
দূরে - আরো দূরে।
রাতে নিওন আলো পেলাম, এক টুকরো পাঁউরুটিতে।
সহৃদয় উষ্ণ পোষাক পেলাম আমার গুটিসুটিতে।
তারা তিনজন...
মদের খেয়ালে আমাকে করাল প্রসাধন।
এই প্রথমবার আমার চার-চাকার পেটের মধ্যে পদার্পণ।
আমি কি তাদের বন্দিনী?
এমন ভাবে তো ভাবিনি।
নাহ, আমি স্বাধীন, স্বেচ্ছায় সঁপে দিলাম সব।
তারা সবাই আমাকে ছুঁইয়ে দিল।
আমি আমার প্রত্যেক ফোঁটা রক্ত বিন্দু দিয়ে ভোগ করলাম তিন মুহুর্ত।
কালাবর্তে আমাকে আবার কোলে তুলে নিল ফুটপাথ।
তখন গভীর রাত।
কানের লতিতে, নাভিতে তখন আমার সেরা পারফিউম।
ভারী চোখের পাতায় একুশ বছরের ঘুম।
কাল আবার ভোর পাঁচটায় সূর্য দেখব।
কাল আসিস ফের, তোদের জন্য রেখে যাব লবডঙ্কা।
আমার উদ্দেশ্য মোহনা -
যেখানে নদী হয়েছে বাধাহীন।
তোরা বলবি বলনা, "ভিখারিনী", "নষ্টা"; আমি আসলেই স্বাধীন।
=====================================================================
আগস্ট ১৫, ২০১৫
সৌরেন্দ্র নাথ কুণ্ডু

ঘোর নারীবাদ

এক বুক ভালোবাসায় শপথ করেছিলে।
তবু আজ আমি এক বুক লেলিহান শিখায়--
আমি অগ্নিপরীক্ষায়...

আমাকে দিয়েছ শুধু 
হাতে-সাজা পান
এক মুঠো ভান
কোল ভরা অভিমান।

আর ভোরের আজান,
মিছিলের গান
শুধু তোমার...

নারী-অভিমানী রূপকের নাম জল।
আমাকে রেখেছ তুমি
কুঁজোয় ঘড়ায়।
বোতল ভরিয়েছ ফ্রিজের শীতে।
বাকি সবটুকু তোমার, ঠিক বিপরীতে...

আমি তোমার জিভের আস্বাদন
কালো চুলে, নাভিতে, যোনিতে।
আমি তোমার প্রাণের সুরায়--
ধমনীতে - শোণিতে।

চেয়েছি গঙ্গা হতে, যমুনা হতে।
পেয়েছি অনেক - তবু কিন্তু...
তুমি মায়া দেখোনি, দূর্গা দেখোনি, বন্যা দেখেছ?

এসো, আমায় শিকল মুক্ত করো।
আমি পার্বতী, আমি নারী,
আমি তোমার মত হাজার শিশুর
জন্ম দিতে পারি।

_____________________________________________
সৌরেন্দ্র নাথ কুণ্ডু
৩০-১-১৪২২ / 14-May-2015
৭ঃ১০ অপরাহ্ন

।। কুটো ।।

জানি, বাঁচতে হবে।
তাকেও ছাড়া বাঁচতে হবে।
রাখতে হবে পুরানো খামে
তবু নতুন চিঠি।
...
বৃষ্টি এলে ভাসবে সবই...
চিঠিও ভিজে যাবে।
তবু ভাসবে নৌকা হয়ে
চিঠির কথা দুটো।
...
আজও আমি ডুবছি
খুঁজে সেই দুটি খড় কুটো।

।। উল্টে ।।



নিষাদের সুর ধরি - বিষাদের যাত্রী।
ঘুম ভেঙে চোখ খুলি, তবু ঘন রাত্রি।

মায়া মায়া ছায়া-ঘন মেঘ ফুঁড়ে বৃষ্টি।
চাঁদ নেই, তারা নেই -- দূর-ছোঁয় দৃষ্টি।

বিছানায় - বালিশেতে আতরের কাঁথা-লেপ।
হাতে পায়ে পচা প্রেম, মেঝে জোড়া আক্ষেপ।

ঘুরে বসি, ধুলো ঝেড়ে, ছাত ধরে ঝুলতে।
বাদুড়ের চোখ দিয়ে দেব সব উলটে...

১৮।০১।১৪২২
ইংঃ- ০২।০৫।২০১৫ ১১ঃ২৯ অপরাহ্ন

স্বপ্ন ভঙ্গ


তোরা যখন হাসতে থাকিস
   আমার তখন কান্না,
আমি যখন টিকেট কিনি,
   তোরা বলিস, আর না।
ঘরের যখন দরজা খুলি
   তোদের তখন রাত।
সবাই যখন হাতটা গুটাস
   একলা বাড়াই হাত।
কখন যে তোর খুশির সময়
   আমার বোঝা দায়।
আমি যখন হাততালি দিই
   তোরা করিস 'হায়'।
একফালি চাঁদ - আর ঘাস ফুল
   স্বপ্নে আমার রোজ।
তোদের তখন রাত-বিছানায়
   ঘুমটুকু নিখোঁজ।
তোরা ভাবিস আঁতেল আমি
   আমায় 'ছি ছি' দিস।
স্বপ্ন আমার মিথ্যে হলে
   প্লীজ, দলে নিস। 
==========================================================================
সৌরেন্দ্র নাথ কুন্ডু 
জুলাই ২৮, ২০১২। ০২-৫৫ পিএম

।। নেশাযাপন ।।

কার্ণিশে সূর্যটা ধূলোয় অগোছালো।
টেবিলের কম্পিউটারে এলোমেলো মরচে।
বৃষ্টিধারায় নস্টালজিয়ায় ফিরতে ইচ্ছে করছে।
সন্ধ্যে নামলে নীল আঁধারে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।
স্বপ্নগুলোর ছায়ার রেখা অল্প অল্প সরছে।
লাল জ্বললুনি গলায়, শিরায় --
ভীষণ মাথা ধরছে ।
গালে-ছাতায় জলের ফোঁটায় বড্ড মনে পড়ছে।

সৌরেন্দ্র নাথ কুণ্ডু
০৮-৪১পূর্বাহ্ন
এপ্রিল - ১৩ - ২০১৪

।। রাজকন্যা ।।

কাল আমার অল্প লাল ।
মিষ্টি রোদে নরম গাল ।
ঘামছে মন ।
বারান্দা আর একলা ঘর ।
বুকে চোখে ভীষণ জ্বর ।
নীচে রাস্তায় সাইকেলের গুঞ্জন ।
গুনছি কড়ি গুনছি রোজ ।
দশটা পাঁচটার ব্যর্থ খোঁজ -
কাজল চোখ ।
আজ হাওয়ার কানে নুপূর-গানের ঝোঁক ।
.
আলতা ধুলোয় পায়ের দাগ ।
সিন্ডেরেলার গল্পে থাক
একটু মিল ।
ডাস্টবিনেতে ছেঁড়া চিঠির ভীড় ।
রুমাল-বালিশ ঘুম-ঘামে অস্হির ।
ঠোঁটে নেশায় আতুর টলতে থাকে তিল ।
ঘড়ি-কাঁটায় ঝোলে অপেক্ষা মিছিল ।। 


সৌরেন্দ্র নাথ কুণ্ডু
০৮-২৬ পূর্বাহ্ন
এপ্রিল - ১৩ - ২০১৪

।। বদল না-বদল ।।



কাশটা অনেকক্ষন থেকেই সিংহের মত গর্জন করছিল কালো মেঘের চাদরে ছেয়ে গেছিল যেন যেকোনো মুহুর্তে বৃষ্টি নামবে কিন্তু আমাদের খেলার বিরাম ছিল না মধ্যমাটা টেনে আস্তে করে ছেড়ে দিতেই ঠকাস শব্দে আমার গুলিটা রামের চুনি গুলিটাকে মেরে গর্তে গিয়ে পড়ল আমি হুররে বলে চিৎকার করে উঠতে যাব এমন সময় আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামল আলতা দিদি আর রাখালকে আমি যখন ইচ্ছে আমার দলে টেনে নিতে পারি আমার চোখের ইশারা বুঝলেই তারা এক পায়ে খাড়া আজও তেমনভাবেই তাদের দলে টেনে নিয়েছিলাম ইচ্ছে ছিল চোর বানিয়ে রামকে খুব খাটাব কিন্তু তা আর হল না বৃষ্টি নামতে না নামতেই রাম তার চুনি গুলি আর ঢ্যাপ গুলিটাকে দু মুঠোয় তুলে ভোঁ ভোঁ দৌড় দিল বাড়ির দিকে আমি ব্যর্থ চোখে একে একে রাখাল আর আলতা দিদির মুখের দিকে তাকালাম রাখাল বলল, 'ও তুই ভাবিস নি রে লয়, ওকে তো আজ না হোক কাল, কাল না হোক পরশু খেলতে আসতেই হবে আজকের হিসেবের জেরটা পরের দিন টেনে নিলেই হল' আলতা দিদি মিষ্টি করে বলল, 'যাহ্‌, সে আবার হয় নাকি? হুড়কে হয়ে যাবে না? লয় তো কালকেই চলে যাবে, দল ভেঙ্গে গেলে জের টানবি কি করে শুনি?' আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল কালই তো চলে যেতে হবে ইস! আর একটা দিনও যদি থেকে যেতে পারতুম মন খারাপ করে ঘরে ফেরার সময়েই জামা প্যান্ট ভিজে চুপচুপে
গুড়ুম করে আকাশটা ডেকে ওঠায় চটকা ভেঙ্গে গেল ওফ! একদম টাটকা ঘটনার মত একটা ফ্ল্যাশ ব্যাক কতদিন হবে? তা..., প্রায় দশ বছর তো হবেই আরো দু এক বছর বেশি বই কম না কাঁসি থেকে এক মুঠো মুড়ি তুলে গালে পুরলাম বারান্দায় মা বসে মামীমাকে রান্নায় সাহায্য করায় ব্যস্ত ওপাশের ঘরে খুব সম্ভব বাবা আর মেসো মোহনবাগান বনাম ইস্টবেঙ্গল খেল দেখতে বসেছে মাঝে মাঝে বাবার গলা পাই, 'ইস', 'উস' বা 'গোওওওল!' তো পরক্ষণেই মেসোর চিৎকার, 'চুপ করো ভাই, অত সোজা নয়' বা কখনও কখনও বাবার মিমিক্রিতে মেসোর পালটা কন্ঠধ্বনি, 'ইস', 'উস' বা 'হায় হায়, গোল হল না' মাসির মেয়ে রাখি আর মামার মেয়ে আধুলি গেছে ত্রিনয়নী সঙ্ঘের প্যান্ডেল বাঁধা দেখতে হয়ত একটু পরেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামবে শঙ্কিত মাসি হাতে ছাতা নিয়ে ত্রিনয়নী ক্লাবের মাঠের দিকে মেয়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়ল ত্রিনয়নী ক্লাবের বিশেষত্ব হল, ওরা পুজোর প্যান্ডেল নিজেরাই বানায় আমাদের কলকাতার মত দক্ষ মানুষদের দিয়ে কাজ করানো ওদের রেওয়াজ নয় আজ আসার সময় দেখে এসেছি কি আশ্চর্‍্য ভাবে ওরা নিজেরাই দলবেঁধে নিরলস কাজ করে চলেছে দেখলে মোটেই মনে হয়না ওরা অ্যামাচার তার থেকেও আশ্চর্য লাগল আধুলি আর রাখির সখ্যতা দেখে পাঁচ বছর আগেও তো ওরা পুজোর দিন মেলা থেকে কেনা বেলুন গুলোর অধিকারের দাবিতে একে অপরের বেলুন ফাটিয়ে দিয়েছিল তারপর দুজনের একে অপরের চুলের ঝুঁটি ধরে সে কি মারামারি! বাপস লাফালাফিতে দোরের ফানুস আলোটা উলটে দিয়ে প্রায় অগ্নিকান্ড বাধার জোগাড় আজ আর সে ফানুস আলো নেই ইলেক্ট্রিসিটি এসেছে বোধহয় তিন বছর হল আগের সেই মাটির মামারবাড়িটাই তো নেই এখন সকালে যখন এলাম মায়ের সাথে, চিনতে পারিনি এই দোতলা পাকা বাড়িটা আমার মামার পাশের বাড়ির শান্তা পিসি মাছ বাছতে বসেছিল আমাদের দেখে বলে ফেলল, 'ওমা, দেখ দেখ কারা এসেছে' আমি ঠিক তখনই বুঝে ফেললাম এই সামনের পাকা বাড়িটাই আমার মামার ঢোকার মুখে চোখে পড়ল দরজার পাশে দুটো ছোট্ট ছোট্ট লাল ফুলের গাছ খেয়াল হল দিদুন নেই আজ তিন বছর হল যখন ছিল তখন বাড়ির সামনেটা গাছে গাছে ছয়লাপ করে রাখত
অনেক কিছুই তো পালটে গেছে আসার পথে বেশ কিছুটা পায়ে চলা পথ হেঁটে আসার সময় রাখালকে দেখলাম প্যান্ডেল বাঁধতে আমার সঙ্গে চোখাচুখি হতে একটা স্মিত হাসি ছড়িয়ে গেল তার মুখ জুড়ে আগে যখন প্রথম দেখা হত অনেক দিনের পর, তখন আগের কাজ পরের জন্য ফেলে দৌড়ে আসত আমার কাছে মৃন্ময়ের সাথে দেখা হল ধোপাদের পুকুরটার একটু আগে সাইকেলে বোঝা চাপিয়ে সকাল সকাল ঘাম ঝরিয়ে কোথায় যেন চলেছে আগে দেখা হলে দাঁড়িয়ে কথা বলত, আজ দ্বিতীয়বার ফের ঘুরে তাকালই না হয়ত বা ব্যস্ত ছিল, না হলে একটাই যুক্তি দাঁড়ায় তার প্রতিক্রিয়ার, হয়ত দারিদ্রের সংকোচ তার মনকে ক্ষুদ্র করে দিয়েছে আমার সাথে কথা বলবার সাহস পাচ্ছে না, যদি আমি ঠিক ভুল কিছু বলে দিই, সেটা খারাপ লাগবে তার কাছে আরো খারাপ লাগল আলতাদিদিকে দেখে টাইমকলে জল নিতে এসেছিল মনে হয় কি বড়ই না হয়ে গেছে আমার চোখে চোখ পড়তেই ঝট করে চোখ সরিয়ে নিল শাড়ির পাড়ের খানিকটা কোমরে গুঁজে জলের বালতিটা তুলে নিয়ে হন হন করে বাড়ির পথে এগোল আমার ইচ্ছে ছিল একবার ডাকি, 'ও আলতাদিদি' বলে, কিন্তু সুযোগ হল না তার পায়ের ছন্দে যেন পালানোর ভঙ্গি অদ্ভুত! আলতাদিদিই তো একমাত্র প্রাণের সাথী এখানে তার এত পরিবর্তন আমার ঠিক সহ্য হল না অনেকক্ষণ তার পায়ের নূপুরের ঝুমঝুম আওয়াজ অনুসরণ করে কান পেতে ছিলাম সেটা সোজা গিয়ে তারপর ডান দিকে বেঁকে আলতাদিদিদের বাড়ির গলিটায় মিলিয়ে গেল
অনেকদিন পর মামারবাড়ি আসার ইচ্ছেটাই কেমন যেন ফিকে হয়ে এসেছিল মাঝের বছর গুলোয় কেন যে আসা হয়নি তা ভেবে বের করতে পারি না হয়ত বা আমার পড়ার জন্য বা এক্সামসের জন্য মা আর কথা তোলেনি নাহলে বাবা হয়ত সেভাবে ছুটি ম্যানেজ করে উঠতে পারেনি সেন্ট্রাল গভর্ণমেন্টের চাকরিতে এমনিতেই ছুটি একটু কম মামা কিন্তু নিয়মিত নেমন্তন্ন করে আমাদের আসতে বলত নিজেও মাঝে মাঝে একবার একবার আসত তার থেকেই এক এক করে পর পর খবর পাওয়া - ঘর তৈরি, বিদ্যুতের ব্যবস্থা, দিদুনের মৃত্যু সংবাদ এইসব যাই হোক, মামার ফোনটা আসার পর থেকেই সব কিছু চেঞ্জ হয়ে গেল পুরানো ঘটনার সাথে মিষ্টি স্মৃতিতে সেই পুরানো মামারবাড়ি সেই মামারবাড়ির ভেজা মাটির উপর গোবর নাতার গন্ধ, পিছনের বাঁশ ঝাড়ের মাথায় আকাশ-আল্পনার মত চাঁদ, সেই দিদুনের বাগানে লুকিয়ে ফুল তোলা, কাউকে না বলতে পারা আরো অনেক কিছু আলতাদিদি আর রাখাল প্রসঙ্গে... অবাক লাগল পাশ থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে সুইচ টিপে দেখলাম 'নো নেটওয়ার্ক কভারেজ' লেখা আমতেল মাখানো মুড়ি আরো একগাল তুলে নিয়ে চিবোতে চিবোতে মনে হল, একটা জিনিস এখনও বদলায়নি, সেটা হল এই তেল মাখা মুড়ির স্বাদ-গন্ধ
----------------------------------------
সকালে দাঁত মাজতে বেরনোর অভিজ্ঞতাটা নতুন নয় এখানে এই এলাকায় সবাই আমায় চেনে ভালোও বাসে খুব আগে দেখা হলেই কলতলায় কেউ না কেউ বলে উঠত, 'কি রে, কবে এলি?' আমি উত্তর দেবার পর আবার প্রশ্ন, 'বাবা এসেছে?' বাবা অনেক সময় ব্যস্ত থাকায় আসতে পারত না, আমি মায়ের সাথে এসে এক ঝলক সময় কাটিয়ে যেতাম মামারবাড়িতে যাক, সেই প্রশ্নের উত্তর দেবার পর আবার আসত পরবর্তী প্রশ্নবাণ, 'কই কাল তো দেখিনি তোকে, ঘরে বসে বসে কাটিয়েছিস সারাদিনটা?' এবার এত বড় প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারতাম না, মুখ ভরা মাজনের ফেনা নিয়ে হ্যাবলা হাসিতে তাকিয়ে থাকতাম বদলে সে আমায় কল থেকে এক মগ জল ধরে দিয়ে খুশি খুশি মুখে বলত, 'যা, ওই ধারে গিয়ে ধুয়ে নে' এসবও অনেক দিন আগের কথা তখন মনে হয় আমার ক্লাস এইট আর আজ ডিগ্রি কোর্স
আশ্চর্য, মামাদের এই ঘরের জানালাটা সেই আগের মতই আছে মাটির বাড়ি যখন ছিল তখনও ঠিক এই জায়গায় এই জানালাটাই বসানো ছিল বাড়ি ভাঙ্গার পরেও জানালাটা ফেলে না দিয়ে রিসাইকেল করা হয়েছে সেখানে বসে আমি আমার ব্যাগ থেকে মাজন ব্রাশটা বের করতে করতে দেখলাম, সামনের কলতলায় ক্ষুদ্র ব্যস্ততা তিন মহিলা জল সংগ্রহ করছে, রুকসানা বিবি, আলতাদিদির মা আর একটা বউ তৃতীয় মহিলা অচেনা তার শাড়ী পরার ঢং দেখলে বোঝা যায় সে কোন বাড়ির নতুন বউ 'নিশ্চই দাদা' বিয়ে করে এনেছে নাকি? সে ছাড়া আর তো কারুর এখন বিয়ের বয়স হবার কথা নয় ছেলে ছোকরাদের কথা বাদ দিই, আমার বয়েসি ছেলেরা আজকাল হঠাত হঠাত বিয়ে করে বউ ঘরে তুলতে শুরু করেছে 'নিশ্চই দাদা'কে মনে হতেই তার একটা কথা মনে পড়ে গেল তার ভাল নাম অসীম কথায় কথায় 'নিশ্চয়ই' শব্দটা এত বেশি ব্যবহার করত যে তার নাম বদলে আমরা দিয়েছিলাম 'নিশ্চই' দাদা আমরা সবাই কি একটা খেলা খেলছিলাম ঐ রমলাদের বাড়ির সামনের মাঠটায় হঠাতই নিশ্চই দাদা কোত্থেকে দৌড়ে এসে আমাদের দিকে চোখ টিপে দিয়ে খেলায় যোগ দিয়েছিল আমরা বুঝলাম নিশ্চই দাদা নিশ্চয়ই কিছু কুকর্ম করে এসে গাঢাকা দিতে খেলায় মন দিয়েছে একটু পরেই রতন বুড়ো একটা কঞ্চি নিয়ে দৌড়ে এল, 'এই শালা অসীমের ব্যাটা এদিকে আয়' আমরা দাঁড়িয়ে গেলাম খেলা ভুলে, রগড় একচোট লাগবে এবার নিশ্চই দাদা বুক ফুলিয়ে এগিয়ে গেছিল রতন বুড়োর দিকে, 'কি ব্যাপার খুড়ো?' 'শালা আমার গাছের পিয়ারা চুরি করিস কর কিন্তু সাধের কুমড়ো গাছটার বারোটা বাজালি কেন হারামজাদা?' নিশ্চই দাদার তৎক্ষণাৎ উত্তর, 'নিশ্চয়ই! তোমার গাছের পেয়ারা খেতে আমার বয়েই গে...' আরো চকিতে একটা থাপ্পড় এসে পড়ল নিশ্চই দাদার বাঁ গালে, 'হারামজাদা, চুরি করে আবার বুক ফুলিয়ে ওস্তাদি' আমি ভয়ে পালিয়ে এসেছিলাম তারপর সেখান থেকে নিশ্চই দাদার ভুল একটাই ছিল, না এর বদলে নিশ্চয়ই বলে ফেলা পরে সেই ঘটনা নিয়ে চরম হেসেছিলাম আমরা
দরজা দিয়ে বেরিয়ে আমি কলতলার কিছু দূরে এসে দাঁড়ালাম বউটি কলতলার কাছেই দাঁড়িয়ে যদি ওখানে গিয়ে দাঁড়ালে বউটি লজ্জা পায় তাই আমি কিঞ্চিৎ দূরে দাঁড়িয়ে আলতাদিদির মা বালতি ভর্তি করার সময় আমায় দেখতে পায়নি ভরে নিয়ে ফেরার সময় আমায় দেখে দাঁড়াল, বলল, 'তুমি কাল এসেছ, না?' আমি থতমত খেয়ে গেলাম রাঙ্গামামীমার কাছে আমি 'তুমি' হলাম কবে থেকে? একটু থেমে মুখের ফেনা রাস্তার পাশে সাবধানে একটা বাড়ির দেওয়াল বাঁচিয়ে ফেলে আমি মুখ ঘুরিয়ে বললাম, 'হ্যাঁ' এবার দ্বিতীয় প্রশ্ন, 'অনেক দিন পর এলে, কদিন থাকবে তো?' একটু হেসে বললাম, 'কালকের দিনটা...' ' একবার এসো পারলে আলতার বিয়ে পরের মাসে, জানো? আর হয় তো দেখা হবে না পরে কাল ও বলছিল, তুমি এসেছ' রাঙ্গামামীমা আর দাঁড়াল না আমি থম মেরে দাঁড়িয়ে গেলাম আলতা দিদির বিয়ে? এই তো সেদিন ফ্রক ছেড়ে চুড়িদার-নাইটি পরা শুরু করেছিল তার সামনের মাসে বিয়ে? বিশ্বাস হল না যেন আবার পরক্ষণেই ভাবলাম, সে তো পাঁচ বছর আগের কথা এখন কি আর সে সেই দিদি আছে? কলটা ফাঁকা রুকসানা বিবি আর সেই নতুন বউটা জল নিয়ে ওই দিকে চলে গেছে আমি কলতলায় নেমে কলের হাতলটায় চাপ দিতেই সেটা পাঁচ বছর আগের সেই পুরানো ক্যাঁচ শব্দে চেঁচিয়ে উঠল যেন বলতে চাইল, আমি ঠিক আগের মত একই আছি
----------------------------------------
আলতাদিদির আর রাখালদের গল্প ভেবে শেষ করা যায় না সাইকেল শেখা, সাঁতার শেখা সবই আমার এই মামারবাড়িতেই সঙ্গী বলতে দুজন শেষ বারের কথা মনে পড়ে, আমার গাছে চড়া শেখা রাখালের থেকেও ভাল গাছে চড়তে জানত আলতাদিদি তরতর করে রতন বুড়োদের পেয়ারা গাছটায় উঠে পড়ত নামার সময় জড়িয়ে ধরে হড়কে নেমে আসত আমি একদিন জিজ্ঞেস করলাম, 'তোমার ভয় করল না, এভাবে নামতে? যদি পড়ে যেতে?' আলতাদিদি অদ্ভুত হেসে বলল, 'ভারি মজা লাগে রে, আরাম হয়' কথার মানে না বুঝেই আমি ঘাড় দুলিয়ে হেসে উঠেছিলাম আলতাদিদি আবার বলেছিল, 'সত্যি বলতে ওঠার থেকে নামার সময়েই ভয় লাগে বেশি নীচের দিকে তাকিয়ে বুক শুকিয়ে যায় অনেকের' হাসল আলতাদিদি, 'আমার যদিও অভ্যেস হয়ে গেছে এখন বর্ষাকালের শ্যাওলা ধরা গাছেও দিব্যি চড়তে পারি'
আমি বললাম, 'তোমার মা বকে না?'
এবার রাখাল বলল, 'মা জানলে তুলো ধোনা করবে পরের গাছের ফল পেড়ে খাওয়া কি ভাল জিনিস নাকি?'
আলতাদিদি কথার মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে বলেছিল, 'গাছে ওঠা শিখবি নাকি রে লয়?'
নেচে উঠেছিলাম আমি, 'তুমি শেখাবে?'
ক্যাঁকালে নাইটির ফাঁকে প্যাঁচ দিয়ে বাঁধা ছিল দুতিনটে ডাঁশা পেয়ারা আমাকে আর রাখালকে একটা একটা দিয়ে নিজে একটাতে কামড় বসিয়ে বলল, 'একজন হলে হয় না দুজন লাগবে আমি উপর থেকে ধরব, রাখাল নীচে দাঁড়াবে তুই পড়ে গেলে তোকে খসে পড়া ফলের মত লুফে নেবে'
রাখাল বলল, 'ঠিক আছে, তাই কোন গাছটা দিয়ে শুরু করা যায়?'
কাছেই একটা তালগাছ ছিল সেটাকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললাম, 'ওই তাল গাছটা দিয়ে শুরু করলে হয় না? ওটা বেশ সাদা সিধে বলে মনে হচ্ছে'
রাখাল আমার কথা শুনে খ্যাক খ্যাক করে বিচ্ছিরি হেসেছিল আলতাদিদি কিন্তু হঠাত গম্ভীর মুখ করে বলল, 'রাখাল, ফাজলামো করিসনি আমি ওপরে উঠি, তুই নীচে থেকে ওকে ঠেলে দে কাঁধ দিয়ে তারপর আমি দেখছি'
কথা শেষ করেই মাঝারি সাইজের ডাঁসা পেয়ারাটা গালে পুরে যেমন করে হনুমানেরা খাবার তুলে মুখের ভেতর জমা করে তেমন করে গালের বাঁদিকে টোপর করে জমিয়ে রেখে পেয়ারা গাছটার মাঝারি গোছের ডালটা ধরে ঝট করে উঠে গেছিল আলতাদিদি উপরে ওঠার জন্য কাঁধ দিল রাখাল কিছুক্ষনের মধ্যেই তিনজনে একসাথে খসা তালের মত আছাড় খেয়েছিলাম মাটিতে দোষ বা ভুল কিছু না একটা ডালে দুজনে একসাথে দাঁড়াতেই মট করে শব্দ উঠেছিল আমি ভাবলাম ডাল ভেঙ্গে গেছে ভয়ে ঝাঁপ দিতে গিয়ে নীচে দেখলাম রাখাল আমায় ধরার বদলে বাঁচার তাগিদে পাশের দিকে লাফ দিয়েছে আলতাদিদি আমার কব্জির কাছটা চেপে ধরতে সেও বেতাল হয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল আমার উপর নীচে ঘাস জমি, তাতে আমার আঘাত কিছু লাগেনি আলতাদিদিরও শরীর নরম, শুধু তার কোমরের কাছে পুঁটলি করা পেয়ারাগুলো আমার পাঁজরায় লেগে টনটনিয়ে গেল আমাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আলতাদিদি বলল, 'ধুর সালা, ভিতুর ডিম' মুখের মধ্যে পেয়ারাটা থাকার জন্য সেটা ফোকলা বুড়ির কথার মত শোনাল রাখাল আমার নীচ থেকে হেঁচড়ে বেরিয়ে আসতে আসতে বলল, 'উফ' সেই আমার প্রথম আর শেষবারের মত গাছ থেকে পড়ে যাওয়া তবে মেয়ে হবার জন্য আলতাদিদিকে কেউ নারকেল গাছ বা তালগাছে উঠতে দিত না সে পারতও না রাখালের মত লুকিয়ে লুকিয়ে নিঃশব্দে নারকেল গাছে উঠতে আর আমি কাউকেই দেখিনি এই ট্রিক গুলো সে নাকি চোরা পূর্ণিমার জন্য স্পেশ্যাল ভাবে শিখেছিল
দুপুরে ভাতটা একটু বেশিই খাওয়া হয়ে গেছিল বিছানায় শুতেই তন্দ্রা এসে গেল চোখ বুজে দেখলাম শাড়ী পরা আলতাদিদি পেয়ারা গাছে উঠছে ধুর, ভাবা যায় না
----------------------------------------
বিকেলে মামা বলল যে বাড়িতে নাকি ডিম ফুরিয়ে গেছে রাত্রে মামীমা ডিমের পরটা বানানোর পরিকল্পনা করেছে মেসো বা বাবাকে এই বেগার কাজের জন্য অনুরোধ করা ঠিক হবে না, অতএব আমাকেই যেতে হবে সাহাদের দোকানটা বিকেলেও খোলা থাকে আমি বেরিয়ে পড়লাম নাইলনের তৈরি বাজারের ব্যাগটা নিয়ে ইটের রাস্তা ফেলে বড় বাস চলা রাস্তায় উঠেই রাস্তার ওপারে চোখে পড়ে একটা বড় কৃষ্ণচূড়া গাছ ছোটবেলায় ওটাকে দারুন বড় একটা দৈত্য মনে হত, আজ মনে হল যেন একটা একলা বসে থাকা অল্পবয়সি মেয়ে তাতে নিজের মনেই হাসি পেল একটু আর একটু হেঁটে যেতেই একটা দৃশ্য দেখে হাসিটা তুমুল ভাবে ভস ভস করে সোডার মত ফেটে বেরিয়ে আসতে লাগল ছোট গলিটার পাশেই ছোট ডিস্পেন্সারিতে বসেন প্রবীন ডাক্তার নবীন হালদার সাইনবোর্ড টাঙ্গানোঃ "নবীন হালদার এম বি বি এস (কলি) সকাল এগারটা থেকে দুপুর দুটো বিকেল চারটে থেকে রাত নটা বৃহঃবার পূর্ণদিবস বন্ধ" বোর্ডটা এমনইভাবে বেঁকিয়ে টাঙ্গানো যে সেটা সরু রাস্তা বা বড় রাস্তা দুটো থেকেই ভালভাবে দেখা যায় রাস্তা নির্জন দেখে দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল তিরিশ সেকেন্ড পরে কাজ সারা হলে এদিক ওদিক তাকালাম নাহ, কেউ দেখেনি হাত থেকে ঢিলটা ফেলে দিয়ে এগোলাম সাইনবোর্ডের নাম বদলে গেছে নবীনের ন হয়ে গেছে প্রবীনের প্র
আরো খানিক এগোতে ভীড়টা চোখে পড়ল আমি তো অবাক ভীড় পেরিয়ে মোড় ঘুরতেই দেখি আশ্চর্য ব্যাপার, বিকেলের বাজার বসেছে রাস্তার ধারে মনে করার চেষ্টা করলাম পাঁচ বছর আগের কথা হ্যাঁ, বিকেলে দিদুন তাজা মুরগীর মাংস আনতে দিয়েছিল আমায় এখানে তখন আশে পাশে ঘন বাঁশ ঝাড় ফিরতে সন্ধে হয়েছিল মনে আছে শেয়ালের জ্বলজ্বলে চোখগুলো বাজারেই আমি ডিম খোঁজার একটু বিফল চেষ্টা করে আবার এগোলাম সামনে একটা প্যান্ডেল বাঁধার কাজ শেষ হয়েছে বোধহয় নতুন কোনো ক্লাব ছোটখাটো আয়োজনের সাথে তিনটে বড় বড় লাউডস্পীকার লাগানো মনে হয় পুলিসের বারন আছে, নাহলে এতক্ষনে এলাকা কাঁপিয়ে দিত এরা জটলা আর আলোর মেলা পার করতে না করতেই সামনে সাহাদের দোকানটা চোখে পড়ল সেই এক-ই রকম দরাজ দরজা জানালা নতুন রঙ মাখানো হয়েছে, তাই রঙের গন্ধ ছড়াচ্ছে এবেলা মাংস বিক্রি হয় না শুধু ডিম দোকানে একটাও খদ্দের ছিল না আমি ঢুকতেই বিশু কাকু বলে উঠল, 'কি চাই? হাঁসের না পোল্ট্রির?' আমি ও কথায় কান দিলাম না, বললাম, 'কেমন আছ বিশুকাকা?' ষাট ওয়াটের বাল্বের নীচে বিশুকাকার কাঁচাপাকা চুলদাড়ি ভরা মুখ ঠিক আগের মত না না, একটা সোনালি ফ্রেমের বাই ফোকাল চশমা দেখছি নতুন বিশু কাকা চশমার ফাঁক দিয়ে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষন কোনো প্রশ্ন ছুঁড়ল না আমি নিজেই উত্তর দিলাম, 'আমি কিশলয় গো, রবিন মুখার্জীর ভাগ্না' দু দন্ড আরো চোখ কুঁচকে দেখে নিয়ে বিশুকাকা বলল, 'লয় বাবু নাকি গো? চিনতেই পারিনি যে কবে এলে?' আগে বাবু শুনলে ভাল লাগত, এখন কেমন কেমন লাগল পকেট থেকে ওয়ালেটটা বের করে নোট গুনতে গুনতে বললাম, 'কাল সকালে তুমি এমন বুড়ো মেরে গেলে কবে?' উদার হেসে বিশু কাকা বলল, 'দেখতে দেখতে পঞ্চাশের তিন বাড়া চুল পেকে গেছে বলে বলছ, না? হাহা' হঠাত যেন খেই হারিয়েও আবার খুঁজে পেয়ে বলল, 'ওহো, মা কেমন আছে? তাকে অনেক দিন দেখিনি' মুচকি হেসে আমি বললাম, 'ভাল না থাকলে আসি কি করে বলো!' পকেটে ফোনটা ভাইভ্রেট করে উঠল এমন সময় ডিমের অর্ডার দিয়ে ফোনটা বের করে দেখলাম এক রাশ মিসড কল এলার্ট তনয় অর্পিতা বা সাদ্দাম কাউকেই জানিয়ে আসিনি যে আমি মামারবাড়ি আসছি তারা নিশ্চয়ই আমায় গোরু খোঁজা খুঁজেছে ফোনে না পেয়ে বাড়ি পর্যন্তও এসেছে হয়ত হিস্ট্রি স্যারের উদ্দেশ্যে একটা ছোট্ট ম্যাসেজ পাঠিয়ে দিয়ে মুখ তুলে দেখি বিশু কাকা হাতে ডিমের প্যাকেটটা নিয়ে অনেকক্ষণ আমার দিকে চেয়ে রয়েছে ফোন নিয়ে ব্যস্ত দেখেই হয়ত কিছু বলতে পারেনি আমি সেটা নিয়ে বাজারের ব্যাগে ভরার সময় হলুদ আলোয় ডিমগুলো দেখলাম চকিতে মনে পড়ে গেল দিদুনের ডিম ফাটানোর দৃশ্য মামীমার হাত, দিদুনের হাত, কি জানি তফাত নাকি মিল... ভাবতে ভাল্লাগে না এসব
----------------------------------------
রান্না ঘরের চেহারা পাল্টেছে দেওয়ালের কোনে রাখতে যেতেই মামীমা আহা আহা করে উঠল বলল, 'এখন ওই খানে ঝুলিয়ে রাখ, তোর মা নামিয়ে নেবে 'খন' মামীমা বেরিয়ে গেল হাতে এক গোছা ধূপ আর একটা প্রদীপ গায়ে এলোমেলো পাকে জড়ানো সুতির কাপড় মামীমা তাড়াহুড়ো করছে বুঝলাম এই বেশে যদি মেসো বা বাবার সামনে দাঁড়াতে হয়, তবে মুশকিল পাশের ঘরে টিভি বন্ধ রাখী আর আধুলির পাত্তা নেই ফেরার সময় দেখলাম বাবা আর মেসো তাদেরই সঙ্গ দেবার জন্য চলেছে আমাকে দেখে বাবা বলল, 'রান্না হলে আমায় মিসড কল দিস দৌড়ে আসব' উত্তর দিইনি, মনে মনে হেসেছি ফোনে নেটওয়ার্ক থাকলে তবেই সার্ভিস নাহলে লবডঙ্কা
শাঁখ বাজার সময় মা বলল, 'এ কি রে লয়? এখনও রাখাল, আলতা কারোর সাথে দেখা করতে গেলি না? সারা দিন ফোন নিয়ে বসে বসে কাটালি?'
আমি বললাম, 'তাদের কাউকেই তো দেখতে পাইনি' বলেই বুঝলাম মিথ্যে বলেছি ফেরার সময়ও রাখালকে দেখেছি প্যাণ্ডেলের মগে উঠে বাঁশ বাঁধছে আর আলতাদিদি তো আমি ঘরে ফেরার সময়েই আমাকে ক্রস করল ইটের রাস্তার মুখে দৃষ্টি বিনিময়ও হয়েছিল মা বলল, 'তাড়াতাড়ি যা দেখা করে আয় ওরা কি ভাববে বলতো? তুই ছাড়া ওদের এক দন্ড চলত না তুইই বা কি করে আছিস এভাবে ঘরে ঠুকে বসে থেকে থেকে? আমি না হয় রান্না হয়ে গেলে খবর দিয়ে দেব তোকে যাহ্‌, দেরি করিস না'
আমি যাই কি না যাই ভাবতে ভাবতেই বেরিয়ে পড়লাম দু পা এগোলেই কাঁচা রাস্তাটা ইট বাঁধানো রাস্তায় গিয়ে পড়েছে এখানে সন্ধ্যে হলেই ভোল্টেজ লো হয়ে যায় ঘরে ভোল্টেজ স্টেবিলাইজার না রাখলে ইনক্যান্ডিসেন্ট ল্যাম্প গুলো নাইটল্যাম্পের মত মিটমিটে হয়ে যায় চেয়ে দেখলাম পোস্টের গায়ে অনেক উঁচুতে একটা বাল্ব লাগানো নীচে রাস্তায় অল্প কিছু ম্যাড়মেড়ে হলুদ আলো চোখ গেল সেখানে শাড়ী পরে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে আমাকে দেখে সে একটু বিচলিত হয়ে উঠল কাছে যেতে দেখি আলতাদিদি শাড়ীতে দেখার অভ্যেস নেই তাই বুঝতে পারিনি বাঁকা চাঁদের আলোয় শুনশান রাস্তা কে প্রথম কথা বলে উঠল, আমার খেয়াল নেই খেয়াল হতে দেখি, আলতাদিদি বলছে, 'কাল থেকে এসে একবারও বের হসনি দুবার দেখা হল তোর সাথে, এক বারও চিনতে পারলি না তুই যেন কেমন পালটে গেছিস রে লয়' আমি ম্লান হেসে বললাম, 'কি জানি হবে হয়তো, তুমিও তো কম পাল্টাওনি সালোয়ার ছেড়ে শাড়ী বিনুনি ছেড়ে খোঁপা...' কথা থেমে গেল কিছুক্ষন দুজনেই বোবা দাঁড়িয়ে তারপর আলতাদিদিই বলল, 'চল' এটুকুই যথেষ্ট কোথায় যাব, কেন যাব তা বলার দরকার নেই সেসব জানাই আছে আমি আলতাদিদির সাথে হেঁটে চললাম খানিকক্ষণ চলার পর বিদ্যুতের আলো মিলিয়ে এল ঝিঁঝিঁর ডাক শুনতে পেলাম আলতা দিদি পায়ে নূপুর পরেছে ঝিঁঝিঁর ডাকের সাথে সেই নূপুরের শব্দের কি অদ্ভুত মিল
কলতলা ফেলে রেখে আদিমামাদের গোয়াল, নূপুরদিদিদের গোয়াল ফেলে রেখে খালের ধারের সেই চেনা জায়গাটা হাল্কা চাঁদের আলোয় খালের ভরা জল চিকচিক করছে দুজনেই বসলাম পাশাপাশি আমার কোনো কথা বলতে মন চাইল না খানিক পরে আলতাদিদি বলল, 'এই?'
আমি বললাম, 'কি?'
'আমি বিয়ে করছি পরের মাসে, জানিস?'
'না'
অমনি সরাসরি অভিযোগ, 'মিথ্যুক'
'ওসব জেনে আমার লাভ নেই' আমি মুখ খানা ছোট করে বললাম
হেসে দিল আলতাদিদি, ', তাই?'
'তোমাকে আমার কোলকাতার বাড়ির ছবি আঁকার ঘর দেখাব বলেছিলাম মনে আছে?'
আলতাদিদি হাসল মিটিমিটি
আমি পকেট থেকে ফোনটা বের করে কয়েকটা আলগা স্পর্শ করলাম স্ক্রিনে ভেসে উঠল আমার ছবি আঁকার ঘর, 'ড্রইং রুম' বললাম, 'কেমন?'
'পাগল ছেলে' আবার সেই মিটিমিটি হাসি
'বলোনা কেমন ঘরটা? জানতাম, তোমাকে আর দেখানোর সুযোগ পাব না, তাই মোবাইলে তুলে নিয়ে এসেছি'
'হুঁ' আলতাদিদি হঠাত কেমন গম্ভীর হয়ে গেল
আমি থেমে গেলাম আবার আলতাদিদিই পাতলা করে বলে উঠল, 'কেমন আছিস? মেয়ে জুটেছে?' আমি বড় করে হেসে উঠে কথা হালকা করে দিতে যাচ্ছিলাম, আলতাদিদি আগেই বুঝে নিয়ে ছদ্ম চোখ পাকিয়ে বকে দিল, 'চোপ মিথ্যে নয়'
একটু থেমে উত্তর দিলাম, 'তিতলি'
'বাহ, বেশ মিষ্টি নাম তো?'
'আলতাদিদি নামটা এর থেকে অনেক, অনেক বেশি মিষ্টি'
'বাজে বকিস না পদবী কি? কি করছে মেয়েটা? তোর বাড়িতে জানে?'
'তিতলি মুখার্জী আমার সাথেই হিস্ট্রি অনার্স কোচিং-এই আলাপ মা হয়ত জানে'
'হিস্ট্রি অনার্স? বাহ ভাল আচ্ছা, তোর সাথে পড়ে, মানে তোর সমবয়সী তো...'
'না গো, আঠাশ দিনের বড়'
আলতাদিদি সশব্দে হেসে উঠল, 'আবার বয়সে বড়কেই ধরলি?'
কথাটা যেন ঠিক আমার মনঃপুত হল না আমি অন্যদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বসে রইলাম অনেকক্ষণ আলতাদিদিও চুপ সময় চলে যাচ্ছে খালের জলে ভেসে
আমি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেই হঠাতই বললাম, 'আমায় একবার ধরবে গো আলতাদিদি...'
'কেন?' অদ্ভুত বিষ্ময় আলতাদিদির গলায়
'শেষ বার আর কোনোদিনই তো বলব না...' আলতাদিদিকে উত্তর দেবার সুযোগ না দিয়ে আমি ওর বাঁ হাতটা আমার ডান হাতের মুঠোয় আলতো করে ধরলাম আশ্চর্য, আলতাদিদির হাতটা বেশ গরম স্পর্শ কিন্তু সেই আগেরই মত নতুন বলতে গেলে একটা ধাতব আংটি
'তোমার হাতটা গরম কেন?'
'ও কিছু না এরকমই'
'সত্যি বলছ?' আমি আলতাদিদির দিকে ঘুরে চোখে চোখ রাখলাম আলতাদিদি চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল, 'কত বড় হয়ে গেছিস তুই তোকে আর মিথ্যে বলা যায় না তোর চোখে এখন আর চোখও রাখা যায় না'
উত্তরে আমি আলতাদিদিকে বুকের সাথে চেপে জড়িয়ে ধরলাম ফিনফিনে সিল্কের পাঞ্জাবির ওপাশে বেড়ে ওঠা নরম উষ্ণতা বাধা দিল না, কিছু পরে সেও আমাকে জড়িয়ে ধরল আমার নাকের খুব কাছেই আধখোলা অযত্নের খোঁপায় জুঁই ফুলের ঘ্রাণ
'তুমিও যে এত বড় হয়ে গেছ আমি ভাবতে পারিনি'
কোনো উত্তর এলনা একটা উষ্ণতা আমার সারা শরীরে চুঁইয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল সে উষ্ণতা আমার নিজের নাকি আলতাদিদির, বুঝলাম না
'ছাড়' আলতাদিদির গলা ফ্যাসফেসে আমার সন্দেহ হল আলতাদিদিকে ছাড়িয়ে নিয়ে চাঁদের আলোয় দেখলাম তার চোখে জল আমি সাহস করে ওকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারলাম না
'রাখালরা তোকে খুঁজছিল'
'মিথ্যে বলছ'
'তুই ভারি পালটে গেছিস আগে নিজেই আমাদের বাড়ি আসতিস, গল্প করতিস, তালের বড়া খেতিস আর এখন তোর সাথে দেখা করতে আমায় রাস্তায় ধর্ণা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে' আলতাদিদির গলায় অনুযোগের সুর
'আমার তো মনে হচ্ছিল তোমরাই বুঝি আর আমার সাথে দেখা করতে চাও না আসার দিন কলতলায় আমায় দেখে তবে মুখ ঘুরিয়ে নিলে কেন?'
'যে জন্য আজ সন্ধ্যেবেলা তোকে ওবাড়িতে খুঁজতে না গিয়ে পোস্টের নীচে তোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম, সে জন্য'
'খুলে বলো'
'ওরে ও হ্যাবলা, আগামী আঠেরই আমার বিয়ে এমন সময় তোর সাথে দেখা করতে যাওয়া যে খারাপ শোনায় রে'
'আর রাখাল কেন এলনা?'
'জানিস না? সকাল থেকে ও তো ঘোড়ার মত ছুটছে কি খাটুনিই না খাটছে ছেলেটা গতরাত্রে তো বৃষ্টি হয়েছে ধুম কাজ কিছুই করা যায়নি আর আজ প্যান্ডেল বাঁধার লোক তো নেই বললেই চলে কার হাত খোঁড়া তো কার গায়ে জ্বর কার আবার উঁচুতে উঠতে ভয় করে, মাথা ঘোরে একলা কি পেরে ওঠা সম্ভব?'
'আর বলতে হবে না' আমি উঠে পড়লাম
'এ কি, তুই কি প্যান্ডেল বাঁধার কাজে লাগবি নাকি?'
এটাই আশ্চর্যের আদ্ধেক কথা বলার আগেই ধরে নেয় আলতাদিদি 'হ্যাঁ' বলেই দৌড় দিলাম ত্রিনয়নী সঙ্ঘের দিকে
প্যান্ডেলের সামনে এসে দেখি বড় হ্যালোজেন ল্যাম্প লাগিয়ে রাত্রের অন্ধকারে শেষ বাঁধাবুঁধির কাজ চলছে ব্যাপক তৎপরতায় উপরে কাজ করছে রাম, রাখাল, শ্যামল, ভুতুন আর বড়দের মধ্যে আছেন প্রনব কাকা আর আমার মেসো নীচে কয়েকটা চেয়ার পেতে বসে বাবা, রাখি, আধুলি, সুনয়না, প্রতাপের পিসি আরো কত সব ছোট্ট করে ডাক দিলাম, 'রাখাল'
কাজ থামিয়ে মুখ বাড়াল রাখাল চোখে মুখে ঘামের থেকে খুশির ঝলক বেশি বলল, 'কি রে, কোথায় ছিলিস, উঠে আয় তাড়াতাড়ি'
চেয়ে রইলাম, পাঁচ বছর পর দেখা অথচ এমনভাবে ডাকল যেন এই মাত্র আমি কোথায় গিয়ে ফিরে এসেছি আমার চোখে জল চলে এল চোখের পাতা টিপে ধরলাম জল থামাতে ওঠার সময় বাবা একবার না না করে উঠেছিল বটে, কিন্তু আর কে শোনে মনে হল রাখাল আমার থেকে আর খুব বেশি দূরে নেই আমায় ওর কাছে পৌছতেই হবে সামনের এক বুক উঁচু বাঁশটার বাঁধন পরখ করতে করতে বললাম, 'হেব্বি বেঁধেছিস রে' উপর থেকে কথা এল, 'তুই উঠবি বলে..."

সৌরেন্দ্র নাথ কুণ্ডু
পুর্বাহ্ন 03.29.32,
6 ‎সেপ্টেম্বর ‎2013

কিছু কিছু লেখা মন ছুঁয়ে  যায় । সেরকম যদি কিছু মনে হয় তো কমেন্ট আশা করব । যদি খারাপ লাগে তো অবশ্যই কমেন্টে সমালোচনা আশা করব । আপনার মূল্যবান সময় ব্যবহার করতে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ ।