।। বদল না-বদল ।।



কাশটা অনেকক্ষন থেকেই সিংহের মত গর্জন করছিল কালো মেঘের চাদরে ছেয়ে গেছিল যেন যেকোনো মুহুর্তে বৃষ্টি নামবে কিন্তু আমাদের খেলার বিরাম ছিল না মধ্যমাটা টেনে আস্তে করে ছেড়ে দিতেই ঠকাস শব্দে আমার গুলিটা রামের চুনি গুলিটাকে মেরে গর্তে গিয়ে পড়ল আমি হুররে বলে চিৎকার করে উঠতে যাব এমন সময় আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামল আলতা দিদি আর রাখালকে আমি যখন ইচ্ছে আমার দলে টেনে নিতে পারি আমার চোখের ইশারা বুঝলেই তারা এক পায়ে খাড়া আজও তেমনভাবেই তাদের দলে টেনে নিয়েছিলাম ইচ্ছে ছিল চোর বানিয়ে রামকে খুব খাটাব কিন্তু তা আর হল না বৃষ্টি নামতে না নামতেই রাম তার চুনি গুলি আর ঢ্যাপ গুলিটাকে দু মুঠোয় তুলে ভোঁ ভোঁ দৌড় দিল বাড়ির দিকে আমি ব্যর্থ চোখে একে একে রাখাল আর আলতা দিদির মুখের দিকে তাকালাম রাখাল বলল, 'ও তুই ভাবিস নি রে লয়, ওকে তো আজ না হোক কাল, কাল না হোক পরশু খেলতে আসতেই হবে আজকের হিসেবের জেরটা পরের দিন টেনে নিলেই হল' আলতা দিদি মিষ্টি করে বলল, 'যাহ্‌, সে আবার হয় নাকি? হুড়কে হয়ে যাবে না? লয় তো কালকেই চলে যাবে, দল ভেঙ্গে গেলে জের টানবি কি করে শুনি?' আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল কালই তো চলে যেতে হবে ইস! আর একটা দিনও যদি থেকে যেতে পারতুম মন খারাপ করে ঘরে ফেরার সময়েই জামা প্যান্ট ভিজে চুপচুপে
গুড়ুম করে আকাশটা ডেকে ওঠায় চটকা ভেঙ্গে গেল ওফ! একদম টাটকা ঘটনার মত একটা ফ্ল্যাশ ব্যাক কতদিন হবে? তা..., প্রায় দশ বছর তো হবেই আরো দু এক বছর বেশি বই কম না কাঁসি থেকে এক মুঠো মুড়ি তুলে গালে পুরলাম বারান্দায় মা বসে মামীমাকে রান্নায় সাহায্য করায় ব্যস্ত ওপাশের ঘরে খুব সম্ভব বাবা আর মেসো মোহনবাগান বনাম ইস্টবেঙ্গল খেল দেখতে বসেছে মাঝে মাঝে বাবার গলা পাই, 'ইস', 'উস' বা 'গোওওওল!' তো পরক্ষণেই মেসোর চিৎকার, 'চুপ করো ভাই, অত সোজা নয়' বা কখনও কখনও বাবার মিমিক্রিতে মেসোর পালটা কন্ঠধ্বনি, 'ইস', 'উস' বা 'হায় হায়, গোল হল না' মাসির মেয়ে রাখি আর মামার মেয়ে আধুলি গেছে ত্রিনয়নী সঙ্ঘের প্যান্ডেল বাঁধা দেখতে হয়ত একটু পরেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামবে শঙ্কিত মাসি হাতে ছাতা নিয়ে ত্রিনয়নী ক্লাবের মাঠের দিকে মেয়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়ল ত্রিনয়নী ক্লাবের বিশেষত্ব হল, ওরা পুজোর প্যান্ডেল নিজেরাই বানায় আমাদের কলকাতার মত দক্ষ মানুষদের দিয়ে কাজ করানো ওদের রেওয়াজ নয় আজ আসার সময় দেখে এসেছি কি আশ্চর্‍্য ভাবে ওরা নিজেরাই দলবেঁধে নিরলস কাজ করে চলেছে দেখলে মোটেই মনে হয়না ওরা অ্যামাচার তার থেকেও আশ্চর্য লাগল আধুলি আর রাখির সখ্যতা দেখে পাঁচ বছর আগেও তো ওরা পুজোর দিন মেলা থেকে কেনা বেলুন গুলোর অধিকারের দাবিতে একে অপরের বেলুন ফাটিয়ে দিয়েছিল তারপর দুজনের একে অপরের চুলের ঝুঁটি ধরে সে কি মারামারি! বাপস লাফালাফিতে দোরের ফানুস আলোটা উলটে দিয়ে প্রায় অগ্নিকান্ড বাধার জোগাড় আজ আর সে ফানুস আলো নেই ইলেক্ট্রিসিটি এসেছে বোধহয় তিন বছর হল আগের সেই মাটির মামারবাড়িটাই তো নেই এখন সকালে যখন এলাম মায়ের সাথে, চিনতে পারিনি এই দোতলা পাকা বাড়িটা আমার মামার পাশের বাড়ির শান্তা পিসি মাছ বাছতে বসেছিল আমাদের দেখে বলে ফেলল, 'ওমা, দেখ দেখ কারা এসেছে' আমি ঠিক তখনই বুঝে ফেললাম এই সামনের পাকা বাড়িটাই আমার মামার ঢোকার মুখে চোখে পড়ল দরজার পাশে দুটো ছোট্ট ছোট্ট লাল ফুলের গাছ খেয়াল হল দিদুন নেই আজ তিন বছর হল যখন ছিল তখন বাড়ির সামনেটা গাছে গাছে ছয়লাপ করে রাখত
অনেক কিছুই তো পালটে গেছে আসার পথে বেশ কিছুটা পায়ে চলা পথ হেঁটে আসার সময় রাখালকে দেখলাম প্যান্ডেল বাঁধতে আমার সঙ্গে চোখাচুখি হতে একটা স্মিত হাসি ছড়িয়ে গেল তার মুখ জুড়ে আগে যখন প্রথম দেখা হত অনেক দিনের পর, তখন আগের কাজ পরের জন্য ফেলে দৌড়ে আসত আমার কাছে মৃন্ময়ের সাথে দেখা হল ধোপাদের পুকুরটার একটু আগে সাইকেলে বোঝা চাপিয়ে সকাল সকাল ঘাম ঝরিয়ে কোথায় যেন চলেছে আগে দেখা হলে দাঁড়িয়ে কথা বলত, আজ দ্বিতীয়বার ফের ঘুরে তাকালই না হয়ত বা ব্যস্ত ছিল, না হলে একটাই যুক্তি দাঁড়ায় তার প্রতিক্রিয়ার, হয়ত দারিদ্রের সংকোচ তার মনকে ক্ষুদ্র করে দিয়েছে আমার সাথে কথা বলবার সাহস পাচ্ছে না, যদি আমি ঠিক ভুল কিছু বলে দিই, সেটা খারাপ লাগবে তার কাছে আরো খারাপ লাগল আলতাদিদিকে দেখে টাইমকলে জল নিতে এসেছিল মনে হয় কি বড়ই না হয়ে গেছে আমার চোখে চোখ পড়তেই ঝট করে চোখ সরিয়ে নিল শাড়ির পাড়ের খানিকটা কোমরে গুঁজে জলের বালতিটা তুলে নিয়ে হন হন করে বাড়ির পথে এগোল আমার ইচ্ছে ছিল একবার ডাকি, 'ও আলতাদিদি' বলে, কিন্তু সুযোগ হল না তার পায়ের ছন্দে যেন পালানোর ভঙ্গি অদ্ভুত! আলতাদিদিই তো একমাত্র প্রাণের সাথী এখানে তার এত পরিবর্তন আমার ঠিক সহ্য হল না অনেকক্ষণ তার পায়ের নূপুরের ঝুমঝুম আওয়াজ অনুসরণ করে কান পেতে ছিলাম সেটা সোজা গিয়ে তারপর ডান দিকে বেঁকে আলতাদিদিদের বাড়ির গলিটায় মিলিয়ে গেল
অনেকদিন পর মামারবাড়ি আসার ইচ্ছেটাই কেমন যেন ফিকে হয়ে এসেছিল মাঝের বছর গুলোয় কেন যে আসা হয়নি তা ভেবে বের করতে পারি না হয়ত বা আমার পড়ার জন্য বা এক্সামসের জন্য মা আর কথা তোলেনি নাহলে বাবা হয়ত সেভাবে ছুটি ম্যানেজ করে উঠতে পারেনি সেন্ট্রাল গভর্ণমেন্টের চাকরিতে এমনিতেই ছুটি একটু কম মামা কিন্তু নিয়মিত নেমন্তন্ন করে আমাদের আসতে বলত নিজেও মাঝে মাঝে একবার একবার আসত তার থেকেই এক এক করে পর পর খবর পাওয়া - ঘর তৈরি, বিদ্যুতের ব্যবস্থা, দিদুনের মৃত্যু সংবাদ এইসব যাই হোক, মামার ফোনটা আসার পর থেকেই সব কিছু চেঞ্জ হয়ে গেল পুরানো ঘটনার সাথে মিষ্টি স্মৃতিতে সেই পুরানো মামারবাড়ি সেই মামারবাড়ির ভেজা মাটির উপর গোবর নাতার গন্ধ, পিছনের বাঁশ ঝাড়ের মাথায় আকাশ-আল্পনার মত চাঁদ, সেই দিদুনের বাগানে লুকিয়ে ফুল তোলা, কাউকে না বলতে পারা আরো অনেক কিছু আলতাদিদি আর রাখাল প্রসঙ্গে... অবাক লাগল পাশ থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে সুইচ টিপে দেখলাম 'নো নেটওয়ার্ক কভারেজ' লেখা আমতেল মাখানো মুড়ি আরো একগাল তুলে নিয়ে চিবোতে চিবোতে মনে হল, একটা জিনিস এখনও বদলায়নি, সেটা হল এই তেল মাখা মুড়ির স্বাদ-গন্ধ
----------------------------------------
সকালে দাঁত মাজতে বেরনোর অভিজ্ঞতাটা নতুন নয় এখানে এই এলাকায় সবাই আমায় চেনে ভালোও বাসে খুব আগে দেখা হলেই কলতলায় কেউ না কেউ বলে উঠত, 'কি রে, কবে এলি?' আমি উত্তর দেবার পর আবার প্রশ্ন, 'বাবা এসেছে?' বাবা অনেক সময় ব্যস্ত থাকায় আসতে পারত না, আমি মায়ের সাথে এসে এক ঝলক সময় কাটিয়ে যেতাম মামারবাড়িতে যাক, সেই প্রশ্নের উত্তর দেবার পর আবার আসত পরবর্তী প্রশ্নবাণ, 'কই কাল তো দেখিনি তোকে, ঘরে বসে বসে কাটিয়েছিস সারাদিনটা?' এবার এত বড় প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারতাম না, মুখ ভরা মাজনের ফেনা নিয়ে হ্যাবলা হাসিতে তাকিয়ে থাকতাম বদলে সে আমায় কল থেকে এক মগ জল ধরে দিয়ে খুশি খুশি মুখে বলত, 'যা, ওই ধারে গিয়ে ধুয়ে নে' এসবও অনেক দিন আগের কথা তখন মনে হয় আমার ক্লাস এইট আর আজ ডিগ্রি কোর্স
আশ্চর্য, মামাদের এই ঘরের জানালাটা সেই আগের মতই আছে মাটির বাড়ি যখন ছিল তখনও ঠিক এই জায়গায় এই জানালাটাই বসানো ছিল বাড়ি ভাঙ্গার পরেও জানালাটা ফেলে না দিয়ে রিসাইকেল করা হয়েছে সেখানে বসে আমি আমার ব্যাগ থেকে মাজন ব্রাশটা বের করতে করতে দেখলাম, সামনের কলতলায় ক্ষুদ্র ব্যস্ততা তিন মহিলা জল সংগ্রহ করছে, রুকসানা বিবি, আলতাদিদির মা আর একটা বউ তৃতীয় মহিলা অচেনা তার শাড়ী পরার ঢং দেখলে বোঝা যায় সে কোন বাড়ির নতুন বউ 'নিশ্চই দাদা' বিয়ে করে এনেছে নাকি? সে ছাড়া আর তো কারুর এখন বিয়ের বয়স হবার কথা নয় ছেলে ছোকরাদের কথা বাদ দিই, আমার বয়েসি ছেলেরা আজকাল হঠাত হঠাত বিয়ে করে বউ ঘরে তুলতে শুরু করেছে 'নিশ্চই দাদা'কে মনে হতেই তার একটা কথা মনে পড়ে গেল তার ভাল নাম অসীম কথায় কথায় 'নিশ্চয়ই' শব্দটা এত বেশি ব্যবহার করত যে তার নাম বদলে আমরা দিয়েছিলাম 'নিশ্চই' দাদা আমরা সবাই কি একটা খেলা খেলছিলাম ঐ রমলাদের বাড়ির সামনের মাঠটায় হঠাতই নিশ্চই দাদা কোত্থেকে দৌড়ে এসে আমাদের দিকে চোখ টিপে দিয়ে খেলায় যোগ দিয়েছিল আমরা বুঝলাম নিশ্চই দাদা নিশ্চয়ই কিছু কুকর্ম করে এসে গাঢাকা দিতে খেলায় মন দিয়েছে একটু পরেই রতন বুড়ো একটা কঞ্চি নিয়ে দৌড়ে এল, 'এই শালা অসীমের ব্যাটা এদিকে আয়' আমরা দাঁড়িয়ে গেলাম খেলা ভুলে, রগড় একচোট লাগবে এবার নিশ্চই দাদা বুক ফুলিয়ে এগিয়ে গেছিল রতন বুড়োর দিকে, 'কি ব্যাপার খুড়ো?' 'শালা আমার গাছের পিয়ারা চুরি করিস কর কিন্তু সাধের কুমড়ো গাছটার বারোটা বাজালি কেন হারামজাদা?' নিশ্চই দাদার তৎক্ষণাৎ উত্তর, 'নিশ্চয়ই! তোমার গাছের পেয়ারা খেতে আমার বয়েই গে...' আরো চকিতে একটা থাপ্পড় এসে পড়ল নিশ্চই দাদার বাঁ গালে, 'হারামজাদা, চুরি করে আবার বুক ফুলিয়ে ওস্তাদি' আমি ভয়ে পালিয়ে এসেছিলাম তারপর সেখান থেকে নিশ্চই দাদার ভুল একটাই ছিল, না এর বদলে নিশ্চয়ই বলে ফেলা পরে সেই ঘটনা নিয়ে চরম হেসেছিলাম আমরা
দরজা দিয়ে বেরিয়ে আমি কলতলার কিছু দূরে এসে দাঁড়ালাম বউটি কলতলার কাছেই দাঁড়িয়ে যদি ওখানে গিয়ে দাঁড়ালে বউটি লজ্জা পায় তাই আমি কিঞ্চিৎ দূরে দাঁড়িয়ে আলতাদিদির মা বালতি ভর্তি করার সময় আমায় দেখতে পায়নি ভরে নিয়ে ফেরার সময় আমায় দেখে দাঁড়াল, বলল, 'তুমি কাল এসেছ, না?' আমি থতমত খেয়ে গেলাম রাঙ্গামামীমার কাছে আমি 'তুমি' হলাম কবে থেকে? একটু থেমে মুখের ফেনা রাস্তার পাশে সাবধানে একটা বাড়ির দেওয়াল বাঁচিয়ে ফেলে আমি মুখ ঘুরিয়ে বললাম, 'হ্যাঁ' এবার দ্বিতীয় প্রশ্ন, 'অনেক দিন পর এলে, কদিন থাকবে তো?' একটু হেসে বললাম, 'কালকের দিনটা...' ' একবার এসো পারলে আলতার বিয়ে পরের মাসে, জানো? আর হয় তো দেখা হবে না পরে কাল ও বলছিল, তুমি এসেছ' রাঙ্গামামীমা আর দাঁড়াল না আমি থম মেরে দাঁড়িয়ে গেলাম আলতা দিদির বিয়ে? এই তো সেদিন ফ্রক ছেড়ে চুড়িদার-নাইটি পরা শুরু করেছিল তার সামনের মাসে বিয়ে? বিশ্বাস হল না যেন আবার পরক্ষণেই ভাবলাম, সে তো পাঁচ বছর আগের কথা এখন কি আর সে সেই দিদি আছে? কলটা ফাঁকা রুকসানা বিবি আর সেই নতুন বউটা জল নিয়ে ওই দিকে চলে গেছে আমি কলতলায় নেমে কলের হাতলটায় চাপ দিতেই সেটা পাঁচ বছর আগের সেই পুরানো ক্যাঁচ শব্দে চেঁচিয়ে উঠল যেন বলতে চাইল, আমি ঠিক আগের মত একই আছি
----------------------------------------
আলতাদিদির আর রাখালদের গল্প ভেবে শেষ করা যায় না সাইকেল শেখা, সাঁতার শেখা সবই আমার এই মামারবাড়িতেই সঙ্গী বলতে দুজন শেষ বারের কথা মনে পড়ে, আমার গাছে চড়া শেখা রাখালের থেকেও ভাল গাছে চড়তে জানত আলতাদিদি তরতর করে রতন বুড়োদের পেয়ারা গাছটায় উঠে পড়ত নামার সময় জড়িয়ে ধরে হড়কে নেমে আসত আমি একদিন জিজ্ঞেস করলাম, 'তোমার ভয় করল না, এভাবে নামতে? যদি পড়ে যেতে?' আলতাদিদি অদ্ভুত হেসে বলল, 'ভারি মজা লাগে রে, আরাম হয়' কথার মানে না বুঝেই আমি ঘাড় দুলিয়ে হেসে উঠেছিলাম আলতাদিদি আবার বলেছিল, 'সত্যি বলতে ওঠার থেকে নামার সময়েই ভয় লাগে বেশি নীচের দিকে তাকিয়ে বুক শুকিয়ে যায় অনেকের' হাসল আলতাদিদি, 'আমার যদিও অভ্যেস হয়ে গেছে এখন বর্ষাকালের শ্যাওলা ধরা গাছেও দিব্যি চড়তে পারি'
আমি বললাম, 'তোমার মা বকে না?'
এবার রাখাল বলল, 'মা জানলে তুলো ধোনা করবে পরের গাছের ফল পেড়ে খাওয়া কি ভাল জিনিস নাকি?'
আলতাদিদি কথার মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে বলেছিল, 'গাছে ওঠা শিখবি নাকি রে লয়?'
নেচে উঠেছিলাম আমি, 'তুমি শেখাবে?'
ক্যাঁকালে নাইটির ফাঁকে প্যাঁচ দিয়ে বাঁধা ছিল দুতিনটে ডাঁশা পেয়ারা আমাকে আর রাখালকে একটা একটা দিয়ে নিজে একটাতে কামড় বসিয়ে বলল, 'একজন হলে হয় না দুজন লাগবে আমি উপর থেকে ধরব, রাখাল নীচে দাঁড়াবে তুই পড়ে গেলে তোকে খসে পড়া ফলের মত লুফে নেবে'
রাখাল বলল, 'ঠিক আছে, তাই কোন গাছটা দিয়ে শুরু করা যায়?'
কাছেই একটা তালগাছ ছিল সেটাকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললাম, 'ওই তাল গাছটা দিয়ে শুরু করলে হয় না? ওটা বেশ সাদা সিধে বলে মনে হচ্ছে'
রাখাল আমার কথা শুনে খ্যাক খ্যাক করে বিচ্ছিরি হেসেছিল আলতাদিদি কিন্তু হঠাত গম্ভীর মুখ করে বলল, 'রাখাল, ফাজলামো করিসনি আমি ওপরে উঠি, তুই নীচে থেকে ওকে ঠেলে দে কাঁধ দিয়ে তারপর আমি দেখছি'
কথা শেষ করেই মাঝারি সাইজের ডাঁসা পেয়ারাটা গালে পুরে যেমন করে হনুমানেরা খাবার তুলে মুখের ভেতর জমা করে তেমন করে গালের বাঁদিকে টোপর করে জমিয়ে রেখে পেয়ারা গাছটার মাঝারি গোছের ডালটা ধরে ঝট করে উঠে গেছিল আলতাদিদি উপরে ওঠার জন্য কাঁধ দিল রাখাল কিছুক্ষনের মধ্যেই তিনজনে একসাথে খসা তালের মত আছাড় খেয়েছিলাম মাটিতে দোষ বা ভুল কিছু না একটা ডালে দুজনে একসাথে দাঁড়াতেই মট করে শব্দ উঠেছিল আমি ভাবলাম ডাল ভেঙ্গে গেছে ভয়ে ঝাঁপ দিতে গিয়ে নীচে দেখলাম রাখাল আমায় ধরার বদলে বাঁচার তাগিদে পাশের দিকে লাফ দিয়েছে আলতাদিদি আমার কব্জির কাছটা চেপে ধরতে সেও বেতাল হয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল আমার উপর নীচে ঘাস জমি, তাতে আমার আঘাত কিছু লাগেনি আলতাদিদিরও শরীর নরম, শুধু তার কোমরের কাছে পুঁটলি করা পেয়ারাগুলো আমার পাঁজরায় লেগে টনটনিয়ে গেল আমাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আলতাদিদি বলল, 'ধুর সালা, ভিতুর ডিম' মুখের মধ্যে পেয়ারাটা থাকার জন্য সেটা ফোকলা বুড়ির কথার মত শোনাল রাখাল আমার নীচ থেকে হেঁচড়ে বেরিয়ে আসতে আসতে বলল, 'উফ' সেই আমার প্রথম আর শেষবারের মত গাছ থেকে পড়ে যাওয়া তবে মেয়ে হবার জন্য আলতাদিদিকে কেউ নারকেল গাছ বা তালগাছে উঠতে দিত না সে পারতও না রাখালের মত লুকিয়ে লুকিয়ে নিঃশব্দে নারকেল গাছে উঠতে আর আমি কাউকেই দেখিনি এই ট্রিক গুলো সে নাকি চোরা পূর্ণিমার জন্য স্পেশ্যাল ভাবে শিখেছিল
দুপুরে ভাতটা একটু বেশিই খাওয়া হয়ে গেছিল বিছানায় শুতেই তন্দ্রা এসে গেল চোখ বুজে দেখলাম শাড়ী পরা আলতাদিদি পেয়ারা গাছে উঠছে ধুর, ভাবা যায় না
----------------------------------------
বিকেলে মামা বলল যে বাড়িতে নাকি ডিম ফুরিয়ে গেছে রাত্রে মামীমা ডিমের পরটা বানানোর পরিকল্পনা করেছে মেসো বা বাবাকে এই বেগার কাজের জন্য অনুরোধ করা ঠিক হবে না, অতএব আমাকেই যেতে হবে সাহাদের দোকানটা বিকেলেও খোলা থাকে আমি বেরিয়ে পড়লাম নাইলনের তৈরি বাজারের ব্যাগটা নিয়ে ইটের রাস্তা ফেলে বড় বাস চলা রাস্তায় উঠেই রাস্তার ওপারে চোখে পড়ে একটা বড় কৃষ্ণচূড়া গাছ ছোটবেলায় ওটাকে দারুন বড় একটা দৈত্য মনে হত, আজ মনে হল যেন একটা একলা বসে থাকা অল্পবয়সি মেয়ে তাতে নিজের মনেই হাসি পেল একটু আর একটু হেঁটে যেতেই একটা দৃশ্য দেখে হাসিটা তুমুল ভাবে ভস ভস করে সোডার মত ফেটে বেরিয়ে আসতে লাগল ছোট গলিটার পাশেই ছোট ডিস্পেন্সারিতে বসেন প্রবীন ডাক্তার নবীন হালদার সাইনবোর্ড টাঙ্গানোঃ "নবীন হালদার এম বি বি এস (কলি) সকাল এগারটা থেকে দুপুর দুটো বিকেল চারটে থেকে রাত নটা বৃহঃবার পূর্ণদিবস বন্ধ" বোর্ডটা এমনইভাবে বেঁকিয়ে টাঙ্গানো যে সেটা সরু রাস্তা বা বড় রাস্তা দুটো থেকেই ভালভাবে দেখা যায় রাস্তা নির্জন দেখে দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল তিরিশ সেকেন্ড পরে কাজ সারা হলে এদিক ওদিক তাকালাম নাহ, কেউ দেখেনি হাত থেকে ঢিলটা ফেলে দিয়ে এগোলাম সাইনবোর্ডের নাম বদলে গেছে নবীনের ন হয়ে গেছে প্রবীনের প্র
আরো খানিক এগোতে ভীড়টা চোখে পড়ল আমি তো অবাক ভীড় পেরিয়ে মোড় ঘুরতেই দেখি আশ্চর্য ব্যাপার, বিকেলের বাজার বসেছে রাস্তার ধারে মনে করার চেষ্টা করলাম পাঁচ বছর আগের কথা হ্যাঁ, বিকেলে দিদুন তাজা মুরগীর মাংস আনতে দিয়েছিল আমায় এখানে তখন আশে পাশে ঘন বাঁশ ঝাড় ফিরতে সন্ধে হয়েছিল মনে আছে শেয়ালের জ্বলজ্বলে চোখগুলো বাজারেই আমি ডিম খোঁজার একটু বিফল চেষ্টা করে আবার এগোলাম সামনে একটা প্যান্ডেল বাঁধার কাজ শেষ হয়েছে বোধহয় নতুন কোনো ক্লাব ছোটখাটো আয়োজনের সাথে তিনটে বড় বড় লাউডস্পীকার লাগানো মনে হয় পুলিসের বারন আছে, নাহলে এতক্ষনে এলাকা কাঁপিয়ে দিত এরা জটলা আর আলোর মেলা পার করতে না করতেই সামনে সাহাদের দোকানটা চোখে পড়ল সেই এক-ই রকম দরাজ দরজা জানালা নতুন রঙ মাখানো হয়েছে, তাই রঙের গন্ধ ছড়াচ্ছে এবেলা মাংস বিক্রি হয় না শুধু ডিম দোকানে একটাও খদ্দের ছিল না আমি ঢুকতেই বিশু কাকু বলে উঠল, 'কি চাই? হাঁসের না পোল্ট্রির?' আমি ও কথায় কান দিলাম না, বললাম, 'কেমন আছ বিশুকাকা?' ষাট ওয়াটের বাল্বের নীচে বিশুকাকার কাঁচাপাকা চুলদাড়ি ভরা মুখ ঠিক আগের মত না না, একটা সোনালি ফ্রেমের বাই ফোকাল চশমা দেখছি নতুন বিশু কাকা চশমার ফাঁক দিয়ে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষন কোনো প্রশ্ন ছুঁড়ল না আমি নিজেই উত্তর দিলাম, 'আমি কিশলয় গো, রবিন মুখার্জীর ভাগ্না' দু দন্ড আরো চোখ কুঁচকে দেখে নিয়ে বিশুকাকা বলল, 'লয় বাবু নাকি গো? চিনতেই পারিনি যে কবে এলে?' আগে বাবু শুনলে ভাল লাগত, এখন কেমন কেমন লাগল পকেট থেকে ওয়ালেটটা বের করে নোট গুনতে গুনতে বললাম, 'কাল সকালে তুমি এমন বুড়ো মেরে গেলে কবে?' উদার হেসে বিশু কাকা বলল, 'দেখতে দেখতে পঞ্চাশের তিন বাড়া চুল পেকে গেছে বলে বলছ, না? হাহা' হঠাত যেন খেই হারিয়েও আবার খুঁজে পেয়ে বলল, 'ওহো, মা কেমন আছে? তাকে অনেক দিন দেখিনি' মুচকি হেসে আমি বললাম, 'ভাল না থাকলে আসি কি করে বলো!' পকেটে ফোনটা ভাইভ্রেট করে উঠল এমন সময় ডিমের অর্ডার দিয়ে ফোনটা বের করে দেখলাম এক রাশ মিসড কল এলার্ট তনয় অর্পিতা বা সাদ্দাম কাউকেই জানিয়ে আসিনি যে আমি মামারবাড়ি আসছি তারা নিশ্চয়ই আমায় গোরু খোঁজা খুঁজেছে ফোনে না পেয়ে বাড়ি পর্যন্তও এসেছে হয়ত হিস্ট্রি স্যারের উদ্দেশ্যে একটা ছোট্ট ম্যাসেজ পাঠিয়ে দিয়ে মুখ তুলে দেখি বিশু কাকা হাতে ডিমের প্যাকেটটা নিয়ে অনেকক্ষণ আমার দিকে চেয়ে রয়েছে ফোন নিয়ে ব্যস্ত দেখেই হয়ত কিছু বলতে পারেনি আমি সেটা নিয়ে বাজারের ব্যাগে ভরার সময় হলুদ আলোয় ডিমগুলো দেখলাম চকিতে মনে পড়ে গেল দিদুনের ডিম ফাটানোর দৃশ্য মামীমার হাত, দিদুনের হাত, কি জানি তফাত নাকি মিল... ভাবতে ভাল্লাগে না এসব
----------------------------------------
রান্না ঘরের চেহারা পাল্টেছে দেওয়ালের কোনে রাখতে যেতেই মামীমা আহা আহা করে উঠল বলল, 'এখন ওই খানে ঝুলিয়ে রাখ, তোর মা নামিয়ে নেবে 'খন' মামীমা বেরিয়ে গেল হাতে এক গোছা ধূপ আর একটা প্রদীপ গায়ে এলোমেলো পাকে জড়ানো সুতির কাপড় মামীমা তাড়াহুড়ো করছে বুঝলাম এই বেশে যদি মেসো বা বাবার সামনে দাঁড়াতে হয়, তবে মুশকিল পাশের ঘরে টিভি বন্ধ রাখী আর আধুলির পাত্তা নেই ফেরার সময় দেখলাম বাবা আর মেসো তাদেরই সঙ্গ দেবার জন্য চলেছে আমাকে দেখে বাবা বলল, 'রান্না হলে আমায় মিসড কল দিস দৌড়ে আসব' উত্তর দিইনি, মনে মনে হেসেছি ফোনে নেটওয়ার্ক থাকলে তবেই সার্ভিস নাহলে লবডঙ্কা
শাঁখ বাজার সময় মা বলল, 'এ কি রে লয়? এখনও রাখাল, আলতা কারোর সাথে দেখা করতে গেলি না? সারা দিন ফোন নিয়ে বসে বসে কাটালি?'
আমি বললাম, 'তাদের কাউকেই তো দেখতে পাইনি' বলেই বুঝলাম মিথ্যে বলেছি ফেরার সময়ও রাখালকে দেখেছি প্যাণ্ডেলের মগে উঠে বাঁশ বাঁধছে আর আলতাদিদি তো আমি ঘরে ফেরার সময়েই আমাকে ক্রস করল ইটের রাস্তার মুখে দৃষ্টি বিনিময়ও হয়েছিল মা বলল, 'তাড়াতাড়ি যা দেখা করে আয় ওরা কি ভাববে বলতো? তুই ছাড়া ওদের এক দন্ড চলত না তুইই বা কি করে আছিস এভাবে ঘরে ঠুকে বসে থেকে থেকে? আমি না হয় রান্না হয়ে গেলে খবর দিয়ে দেব তোকে যাহ্‌, দেরি করিস না'
আমি যাই কি না যাই ভাবতে ভাবতেই বেরিয়ে পড়লাম দু পা এগোলেই কাঁচা রাস্তাটা ইট বাঁধানো রাস্তায় গিয়ে পড়েছে এখানে সন্ধ্যে হলেই ভোল্টেজ লো হয়ে যায় ঘরে ভোল্টেজ স্টেবিলাইজার না রাখলে ইনক্যান্ডিসেন্ট ল্যাম্প গুলো নাইটল্যাম্পের মত মিটমিটে হয়ে যায় চেয়ে দেখলাম পোস্টের গায়ে অনেক উঁচুতে একটা বাল্ব লাগানো নীচে রাস্তায় অল্প কিছু ম্যাড়মেড়ে হলুদ আলো চোখ গেল সেখানে শাড়ী পরে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে আমাকে দেখে সে একটু বিচলিত হয়ে উঠল কাছে যেতে দেখি আলতাদিদি শাড়ীতে দেখার অভ্যেস নেই তাই বুঝতে পারিনি বাঁকা চাঁদের আলোয় শুনশান রাস্তা কে প্রথম কথা বলে উঠল, আমার খেয়াল নেই খেয়াল হতে দেখি, আলতাদিদি বলছে, 'কাল থেকে এসে একবারও বের হসনি দুবার দেখা হল তোর সাথে, এক বারও চিনতে পারলি না তুই যেন কেমন পালটে গেছিস রে লয়' আমি ম্লান হেসে বললাম, 'কি জানি হবে হয়তো, তুমিও তো কম পাল্টাওনি সালোয়ার ছেড়ে শাড়ী বিনুনি ছেড়ে খোঁপা...' কথা থেমে গেল কিছুক্ষন দুজনেই বোবা দাঁড়িয়ে তারপর আলতাদিদিই বলল, 'চল' এটুকুই যথেষ্ট কোথায় যাব, কেন যাব তা বলার দরকার নেই সেসব জানাই আছে আমি আলতাদিদির সাথে হেঁটে চললাম খানিকক্ষণ চলার পর বিদ্যুতের আলো মিলিয়ে এল ঝিঁঝিঁর ডাক শুনতে পেলাম আলতা দিদি পায়ে নূপুর পরেছে ঝিঁঝিঁর ডাকের সাথে সেই নূপুরের শব্দের কি অদ্ভুত মিল
কলতলা ফেলে রেখে আদিমামাদের গোয়াল, নূপুরদিদিদের গোয়াল ফেলে রেখে খালের ধারের সেই চেনা জায়গাটা হাল্কা চাঁদের আলোয় খালের ভরা জল চিকচিক করছে দুজনেই বসলাম পাশাপাশি আমার কোনো কথা বলতে মন চাইল না খানিক পরে আলতাদিদি বলল, 'এই?'
আমি বললাম, 'কি?'
'আমি বিয়ে করছি পরের মাসে, জানিস?'
'না'
অমনি সরাসরি অভিযোগ, 'মিথ্যুক'
'ওসব জেনে আমার লাভ নেই' আমি মুখ খানা ছোট করে বললাম
হেসে দিল আলতাদিদি, ', তাই?'
'তোমাকে আমার কোলকাতার বাড়ির ছবি আঁকার ঘর দেখাব বলেছিলাম মনে আছে?'
আলতাদিদি হাসল মিটিমিটি
আমি পকেট থেকে ফোনটা বের করে কয়েকটা আলগা স্পর্শ করলাম স্ক্রিনে ভেসে উঠল আমার ছবি আঁকার ঘর, 'ড্রইং রুম' বললাম, 'কেমন?'
'পাগল ছেলে' আবার সেই মিটিমিটি হাসি
'বলোনা কেমন ঘরটা? জানতাম, তোমাকে আর দেখানোর সুযোগ পাব না, তাই মোবাইলে তুলে নিয়ে এসেছি'
'হুঁ' আলতাদিদি হঠাত কেমন গম্ভীর হয়ে গেল
আমি থেমে গেলাম আবার আলতাদিদিই পাতলা করে বলে উঠল, 'কেমন আছিস? মেয়ে জুটেছে?' আমি বড় করে হেসে উঠে কথা হালকা করে দিতে যাচ্ছিলাম, আলতাদিদি আগেই বুঝে নিয়ে ছদ্ম চোখ পাকিয়ে বকে দিল, 'চোপ মিথ্যে নয়'
একটু থেমে উত্তর দিলাম, 'তিতলি'
'বাহ, বেশ মিষ্টি নাম তো?'
'আলতাদিদি নামটা এর থেকে অনেক, অনেক বেশি মিষ্টি'
'বাজে বকিস না পদবী কি? কি করছে মেয়েটা? তোর বাড়িতে জানে?'
'তিতলি মুখার্জী আমার সাথেই হিস্ট্রি অনার্স কোচিং-এই আলাপ মা হয়ত জানে'
'হিস্ট্রি অনার্স? বাহ ভাল আচ্ছা, তোর সাথে পড়ে, মানে তোর সমবয়সী তো...'
'না গো, আঠাশ দিনের বড়'
আলতাদিদি সশব্দে হেসে উঠল, 'আবার বয়সে বড়কেই ধরলি?'
কথাটা যেন ঠিক আমার মনঃপুত হল না আমি অন্যদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বসে রইলাম অনেকক্ষণ আলতাদিদিও চুপ সময় চলে যাচ্ছে খালের জলে ভেসে
আমি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেই হঠাতই বললাম, 'আমায় একবার ধরবে গো আলতাদিদি...'
'কেন?' অদ্ভুত বিষ্ময় আলতাদিদির গলায়
'শেষ বার আর কোনোদিনই তো বলব না...' আলতাদিদিকে উত্তর দেবার সুযোগ না দিয়ে আমি ওর বাঁ হাতটা আমার ডান হাতের মুঠোয় আলতো করে ধরলাম আশ্চর্য, আলতাদিদির হাতটা বেশ গরম স্পর্শ কিন্তু সেই আগেরই মত নতুন বলতে গেলে একটা ধাতব আংটি
'তোমার হাতটা গরম কেন?'
'ও কিছু না এরকমই'
'সত্যি বলছ?' আমি আলতাদিদির দিকে ঘুরে চোখে চোখ রাখলাম আলতাদিদি চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল, 'কত বড় হয়ে গেছিস তুই তোকে আর মিথ্যে বলা যায় না তোর চোখে এখন আর চোখও রাখা যায় না'
উত্তরে আমি আলতাদিদিকে বুকের সাথে চেপে জড়িয়ে ধরলাম ফিনফিনে সিল্কের পাঞ্জাবির ওপাশে বেড়ে ওঠা নরম উষ্ণতা বাধা দিল না, কিছু পরে সেও আমাকে জড়িয়ে ধরল আমার নাকের খুব কাছেই আধখোলা অযত্নের খোঁপায় জুঁই ফুলের ঘ্রাণ
'তুমিও যে এত বড় হয়ে গেছ আমি ভাবতে পারিনি'
কোনো উত্তর এলনা একটা উষ্ণতা আমার সারা শরীরে চুঁইয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল সে উষ্ণতা আমার নিজের নাকি আলতাদিদির, বুঝলাম না
'ছাড়' আলতাদিদির গলা ফ্যাসফেসে আমার সন্দেহ হল আলতাদিদিকে ছাড়িয়ে নিয়ে চাঁদের আলোয় দেখলাম তার চোখে জল আমি সাহস করে ওকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারলাম না
'রাখালরা তোকে খুঁজছিল'
'মিথ্যে বলছ'
'তুই ভারি পালটে গেছিস আগে নিজেই আমাদের বাড়ি আসতিস, গল্প করতিস, তালের বড়া খেতিস আর এখন তোর সাথে দেখা করতে আমায় রাস্তায় ধর্ণা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে' আলতাদিদির গলায় অনুযোগের সুর
'আমার তো মনে হচ্ছিল তোমরাই বুঝি আর আমার সাথে দেখা করতে চাও না আসার দিন কলতলায় আমায় দেখে তবে মুখ ঘুরিয়ে নিলে কেন?'
'যে জন্য আজ সন্ধ্যেবেলা তোকে ওবাড়িতে খুঁজতে না গিয়ে পোস্টের নীচে তোর জন্য অপেক্ষা করছিলাম, সে জন্য'
'খুলে বলো'
'ওরে ও হ্যাবলা, আগামী আঠেরই আমার বিয়ে এমন সময় তোর সাথে দেখা করতে যাওয়া যে খারাপ শোনায় রে'
'আর রাখাল কেন এলনা?'
'জানিস না? সকাল থেকে ও তো ঘোড়ার মত ছুটছে কি খাটুনিই না খাটছে ছেলেটা গতরাত্রে তো বৃষ্টি হয়েছে ধুম কাজ কিছুই করা যায়নি আর আজ প্যান্ডেল বাঁধার লোক তো নেই বললেই চলে কার হাত খোঁড়া তো কার গায়ে জ্বর কার আবার উঁচুতে উঠতে ভয় করে, মাথা ঘোরে একলা কি পেরে ওঠা সম্ভব?'
'আর বলতে হবে না' আমি উঠে পড়লাম
'এ কি, তুই কি প্যান্ডেল বাঁধার কাজে লাগবি নাকি?'
এটাই আশ্চর্যের আদ্ধেক কথা বলার আগেই ধরে নেয় আলতাদিদি 'হ্যাঁ' বলেই দৌড় দিলাম ত্রিনয়নী সঙ্ঘের দিকে
প্যান্ডেলের সামনে এসে দেখি বড় হ্যালোজেন ল্যাম্প লাগিয়ে রাত্রের অন্ধকারে শেষ বাঁধাবুঁধির কাজ চলছে ব্যাপক তৎপরতায় উপরে কাজ করছে রাম, রাখাল, শ্যামল, ভুতুন আর বড়দের মধ্যে আছেন প্রনব কাকা আর আমার মেসো নীচে কয়েকটা চেয়ার পেতে বসে বাবা, রাখি, আধুলি, সুনয়না, প্রতাপের পিসি আরো কত সব ছোট্ট করে ডাক দিলাম, 'রাখাল'
কাজ থামিয়ে মুখ বাড়াল রাখাল চোখে মুখে ঘামের থেকে খুশির ঝলক বেশি বলল, 'কি রে, কোথায় ছিলিস, উঠে আয় তাড়াতাড়ি'
চেয়ে রইলাম, পাঁচ বছর পর দেখা অথচ এমনভাবে ডাকল যেন এই মাত্র আমি কোথায় গিয়ে ফিরে এসেছি আমার চোখে জল চলে এল চোখের পাতা টিপে ধরলাম জল থামাতে ওঠার সময় বাবা একবার না না করে উঠেছিল বটে, কিন্তু আর কে শোনে মনে হল রাখাল আমার থেকে আর খুব বেশি দূরে নেই আমায় ওর কাছে পৌছতেই হবে সামনের এক বুক উঁচু বাঁশটার বাঁধন পরখ করতে করতে বললাম, 'হেব্বি বেঁধেছিস রে' উপর থেকে কথা এল, 'তুই উঠবি বলে..."

সৌরেন্দ্র নাথ কুণ্ডু
পুর্বাহ্ন 03.29.32,
6 ‎সেপ্টেম্বর ‎2013

কিছু কিছু লেখা মন ছুঁয়ে  যায় । সেরকম যদি কিছু মনে হয় তো কমেন্ট আশা করব । যদি খারাপ লাগে তো অবশ্যই কমেন্টে সমালোচনা আশা করব । আপনার মূল্যবান সময় ব্যবহার করতে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ ।

৫টি মন্তব্য: