-।। দুর্যোগে যোগ ।।-
পুকুরের ওপারে
তাকালে সার সার তালগাছ গুলোর মাথায় তুঁত-কালো চাঁদোয়ার মত ঘন পুরুষ্টু মেঘটা চোখ
ঠারায়। পাশে দাঁড়করানো সাইকেলের ক্যারিয়ারে বাজারের ব্যাগটা বসিয়ে ফোনটা নিয়ে
টুকটাক ঘাঁটতে ঘাঁটতে অভ্র ক্রসলেগড হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ভরা বাজারের রাস্তার এক কোনে।
মোড়ের মাথা থেকে একটু ভেতরে ঢুকলেই অভ্রদের স্টেশনারি স্টপের হোর্ডিংটা চোখে পড়ে।
কিন্তু ওদিকে এখন তাকানোর যো নেই। এখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে তাকে যতক্ষণ না
সঠিক সময় উপস্থিত হয়। মাথায় বুঝি আজ ভুত চেপেছে। নাহলে এরকম ক্ষ্যাপামি কেউ করে?
হয়ত করে, তা বলে এরকম বাজারের রাস্তায়? ওপাশে পুকুর পাড়ে
আইস্ক্রিম-কোল্ডড্রিঙ্কসের স্টোরটা থেকে রমেশ কাকা মাঝে মাঝেই চশমার উপর দিয়ে
ট্যারা চোখে তাকাচ্ছে। ভাবখানা এমন, ছেলেটার মতলব টা কি? এরকম ভাবে রাস্তায়
দাঁড়িয়ে থাকার ছেলে তো এ নয়! এদিকে পিছনে আলু নিয়ে যে মাসিটা বসে আছে সেও অভ্রকে
দুবার হুশ হুশ করে সরে যাবার নির্দেশ দিয়েছে। একেই তো রাস্তার উপর দোকান, তার উপর
মুখের সামনেটা জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকলে কি করে খদ্দের ঢুকবে। অভ্র তবু কোনো রকমে একপাশে
সরে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মনে এদিক ওদিক চিন্তা। মাথার ঠিক নেই এখন। কাল রাতে যা ঘটে
গেছে তার পর আর ব্যাপারটা সিরিয়াসলি না নিয়ে যায়ই বা কোথায়। বাঁ হাতে ঘড়িটার দিকে
একবার মাত্র চেয়ে আবার ফোনের দিকে লক্ষ্য দিল। সাড়ে এগারোটা বাজে। সময় উপস্থিত।
দৃষ্টি ঘুরতে থাকল- একবার ফোনের স্ক্রিন, একবার মোড়ের মুখ।
কাল রাত্রে শুতে
বুঝি ১২টা বেজেছিল। অভ্রর ডেইলি রুটিনের স্ট্যাটিস্টিক্স দেখলে এটা "আর্লি টু
বেড।" মাইন্ড এমনিতেই লণ্ডভণ্ড ছিল। উটকো চিন্তা আর উড়ো ভাবনায় কাহিল। কাল
সোমবার। কাজ হালকা থাকলে একবার ট্রাই নেওয়া যেতেই পারে ভেবে প্ল্যানিং করতে শুরু
করল শুয়ে শুয়ে। মেয়েটা সপ্তাহে তিন দিন পড়তে আসে পাশের কোচিং সেন্টারে। কাল আসবে
মোটামুটি সাড়ে ন'টা নাগাদ। ফিরবে সাড়ে এগারোটায়। সেই সময় যদি বাজারের মোড়ের কাছে
ধরা যায় মেয়েটাকে...। একটু রিস্ক আছে। বাজারের মুখ, দিনের বেলা অত্যন্ত সেন্সিটিভ
এলাকা। প্রত্যেকটা লোক ওকে খুব ভাল করে চেনে। ছেলে হিসেবে রেপুটেশন ও খারাপ নয়। অতএব,
কোনো কেলোর কীর্তি যাতে না হয় সেদিকে কড়া চাপাচাপি। অনেকেই হয়ত এই সিদ্ধান্তের
জন্য অভ্রকে ক্ষ্যাপা বলবে, কিন্তু ওর হাতে আর কোনো অপশনও নেই। কোচিং সেন্টারের
মুখটা - যাকে বলে ওপেনিং - ঠিক ওদের স্টোরের সামনেই। বাবা অল টাইম স্টোরে থাকে।
অতএব ওখানে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগই নেই। বাবার চোখে পড়লে কি হবে কিছু বলা যায় না।
তাই, বাদ। এপাশে মোড় ঘুরে এলেই আর দু-মিনিট হেঁটেই বাসস্ট্যান্ড। অভ্র অনেকবার
লক্ষ্য করেছে মেয়েটা বান্ধবীদের সাথে ওদিকে বাসস্ট্যাণ্ডের দিকে চলে যায়। নিশ্চয়ই
বাস ধরে বাড়ি ফেরে। এলাকার মেয়ে যে নয়, সেটা দেখেই বোঝা যায়। আশে পাশে মেয়েটাকে
কোনোদিন দেখেনি অভ্র। কি আজব! শেষে এই মেয়েটাকেই ভাল লাগল? কত মেয়ে ফেসবুকে 'পিপল
ইউ মে নো' কলামে আসে, কিন্তু এই মেয়েটা আসে না কেন? অভ্র তো মেয়েটার চলা, কথা বলার
স্টাইল্, চওড়া হাসিটা, আড়চোখে তাকানোটা - মুখস্থ করে ফেলেছে। এর পর ও মেয়েটাকে
অচেনা ভাবা যায় না। কিন্তু ফেসবুক কি আর সেটা বোঝে? ওই কোচিং সেন্টারে কোনো বন্ধুও
নেই যে সমস্ত খবরাখবর বের করে দেবে। আশেপাশে বন্ধুরা সবাই যে-যার নিজের জীবন নিয়ে
ব্যস্ত। যেখানে সবাই চাকরির খোঁজে রাতের ঘুম নষ্ট করছে সেখানে অভ্রেরই বা এরকম হল
কেন! মোটামুটি মেয়েটাকে থামাতে পারলে... না না, এই রাস্তায় থামিয়ে কথা বলা সম্ভব
না। লোকের চোখ টানবে। তার চেয়ে বরং চলতে চলতে কথা বলাই বেটার। ...মেয়েটাকে
মোটামুটি কথা বলতে গেলে কি দিয়ে শুরু করবে তা অভ্রের অনেক দিনেরই ভাবা ছিল। সে হয়ত
এটা জানে যে মেয়েটা কোচিং-এ পড়তে আসে। সম্ভবত বি এ ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। কিন্তু
মেয়েটার কাছে সে সম্পূর্ণ অচেনা। ইংলিশ খুব ভাল হতে পারে। ইংলিশেই কথা বলা যাবে।
মেয়েটাও আর অভ্রকে আওয়ারা মনে করবে না, অভ্রর নিজের দিক থেকেও শিক্ষিত হওয়ার নমুনা
দেওয়া হয়ে যাবে। অতএব যা বলবে সে... মাথা গুলোতে থাকল। ভাসা ভাসা দেখা যাচ্ছে যে
মেয়েটা আসছে। সাথে দুজন বান্ধবী। অভ্রকে রাস্তায় একধারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেনি
বোধহয়। দেখলে কিছু না কিছু রিয়্যাকশান হত। প্রথম দিন যা হয়েছিল...। দুপুরের কোন
একটা সময়ে- বোধ হয় ৩টে বাজে। খাঁ খাঁ রোদ। দোকানপাট সব বন্ধ। গরমে যা হয় আর কি। এই
সময় মেয়েটা কোচিং থেকে ফেরে। ধরতে পারলে কথা বলা যাবে ভেবেই কোচিং এর ঠিক গেটের
সামনে গলিটায় দাঁড়িয়ে রইল ঠায়। এই গরমে এতটা সহ্য করে থাকাটাও বিশেষ স্কিলড
পার্সনের পক্ষেই সম্ভব। ভাবলেই ভয় লাগে। রাস্তায় রাস্তায় সানস্ট্রোক হয়ে মৃত্যুর
খবর প্রত্যেক দিনের কাগজে লেগেই আছে। প্রায় একঘন্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার পর যখন
মেয়েটা একদল বন্ধু বান্ধবের সাথে বেরিয়ে এল তখন হঠাতই অভ্রের স্ট্যামিনা অর্ধেক
হয়ে গেল। আর কাছে আসার পর সেই যে অভ্র "এক্সকিউজ মি" বলে ডাক দিয়েছিল,
তার পর আর কিছু মনে নেই। তবে এটা মনে পড়ে, সমস্ত বন্ধুদের মাঝে ঘেরাও হয়ে একরকম
এসকর্টের ভঙ্গিতে মেয়েটা রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিল। ঠায় দাঁড়িয়ে রয়ে গেছিল অভ্র।
আর একটু কাছে এসে
মেয়েগুলো অভ্রের দিকে তাকাল। আজ মেয়েটাকে আর অন্য কিছু ভাবমূর্তিতে দেখা গেল না,
বরং অভ্রকে দেখে চোখে প্রশ্ন নিয়ে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল। মনে সাহস এল অভ্রের। কাছাকাছি আসতেই
এগিয়ে গেল সাইকেল নিয়ে। কে তাকিয়ে আছে, কে কি ভাবছে সেসব ভাবার সময় নেই। প্রথম
কথাটা বলল, 'ডোন্ট প্যানিক। আই ওন্ট ওয়েস্ট মোর দ্যান থ্রি মিনিটস অফ ইওর টাইম।
কিপ মুভিং, ডোন্ট স্টপ।' মেয়ে গুলো কথাটা শুনল। অদ্ভুত ভাবে বাকি মেয়ে গুলো একটু
পিছিয়ে গিয়ে এবার ওদের দুজনকে এগোতে দিল। কেউ কারোর দিকে চাইছে না। রাস্তার দিকে
চেয়ে এগোচ্ছে বাসস্ট্যান্ডের দিকে। অভ্রর আগে মেয়েটাই কথা বলল, 'আপনার নাম শুনলাম।
আমার বন্ধুদের কেউ কেউ আপনাকে চেনে। আপনি কি চান বলুন সোজাসুজি।' অভ্রের একদম মুখে
কথা রেডি করা ছিল। তক্ষুণি উত্তর দিল, 'ভাল করে যাকে চিনিনা, এমনকি যার নাম
পর্যন্ত জানি না, তার কাছ থেকে আর কি চাইব। তবে দেখি আপনাকে এখান দিয়ে যেতে, মনে
হল নামটা জিজ্ঞেস করি। তাই...'। -'এইটুকুই! কিন্তু নাম জেনে করবেন টা কি?'
-'মানে...' অভ্র একটা অদ্ভুত কথা বলে ফেলল, 'মানে, আপনি মুসলমান নাকি হিন্দু সেটা
না জানতে পারলে আর কি করে কিছু বলি বলুন তো!' মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটল, তার
পর সরাসরি চোখের দিকে চেয়ে বলল, 'অদ্ভুত তো! মুসলমান কি হিন্দু তাতে কি যায় আসে?
আপনি কি আমাকে আই লাভ ইউ বলতে এসেছেন নাকি?' অভ্রের মাথার চাঁদির কাছে কুট কুট করে
উঠল। খানিক চুলকিয়ে পিছন দিকে ফিরে দেখল, বাকি বান্ধবীরা মন দিয়ে শুনছে কিন্তু
কিছুই বলছে না। যেন ওদের কে সব শেখানো আছে। মনটা শক্ত করে নিল অভ্র। চোখে চেয়ে
সরাসরি বলল, 'রাস্তায় চলতে দেখে ভালোবেসে ফেলাটা নেহাত অসম্ভব ব্যাপার। তবে,
সেরকমই কিছু তো বটেই। নাহলে আর মিছিমিছি সময় নষ্ট করাব কেন বলুন, তবে যেটা বলতে
চাই সেটা হল, এভাবে রাস্তায় যোগাযোগ করা তো সম্ভব না আমার পক্ষে, এটা খুব রিস্কি
হয়ে যায়, কাইন্ডলি এটা রাখুন।' পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে দিল অভ্র, ফোন নাম্বার
লেখা আছে আর নীচের নাম লেখা। মেয়েটা নিল হাতে, আর ব্যাগে ভরে দিল। এবার আর জিজ্ঞেস
করতে হল না, সে নিজেই বলল, 'আমার নাম রঙ্গিতা। অ্যান্ড আই হ্যাভ আ বয়ফ্রেণ্ড। আপনার
আর কি বলার আছে?' মনে মনে হায় হায় করে উঠল অভ্র। তবু বুক চেপে বলল, 'তাতে কি
হয়েছে? আমি যেটা করছি সেটা কি অন্যায়? মোটেই না। বাই দ্য ওয়ে, ক্যান ইউ এক্সচেঞ্জ
ইওর্স প্লীজ?' -'মানে? কি এক্সচেঞ্জ করব? নাম্বার?' -'হ্যাঁ, অসুবিধা না
থাকলে...'। রঙ্গিতা কেমন যেন অন্য চাহনিতে বলল, 'দেখুন মিস্টার, আপনাকে নাম্বার
দেবার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। ফালতু স্ক্যাণ্ডাল হবে। তার আগে আপনি প্রুভ করুন দ্যাট
ইউ ডিজার্ভ মি।' অভ্রর সন্দেহ হল, বয়ফ্রেণ্ড আছে, অথচ আবার কথায় ঘুরতে ঘুরতে এদিকে
আসতে চাইছে, ব্যাপারটা কেমন যেন জটিল। মেয়েদের মন বোঝা খুব কঠিন, বিশেষ করে যখন
তারা রহস্য করে তখন। এলোমেলো ভাবতে ভাবতে অভ্র বলে ফেলল, 'কি ভাবে প্রুফ দেব?'
-'আপনি বুঝবেন সেটা। আমার কাছে প্রুভড হলেই হল।' সামনেই বাসস্ট্যাণ্ড। এখানে
রাস্তা একটু ফাঁকা। আর সময় নেই। ঝটিতি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল অভ্র। মুখে একটা চিউইং
গাম ছিল, সেটাকে ঠোঁটের সামনে এনে দাঁতে চেপে ধরল, সোজা রঙ্গিতার দিকে ঘুরে দুই
কানের পাশে দুহাতে ধরে একটা ছোট্ট লিপ কিসে চিউইং গামটা ট্রান্সফার করে দিল। ব্যাপারটা
এতই অপ্রত্যাশিত আর আনাড়ি আর অদ্ভুত আর অসম্ভব আর... যাই হোক, ব্যাপারটা বুঝে উঠতে
উঠতে ঘটনাটা ঘটে গেল বলেই বান্ধবীরা কিছু করার সুযোগ পেল না পেছন থেকে। কথা বলার
ফাঁকে রঙ্গিতার ঠোঁটদুটোও কিছু বলার জন্যই বোধহয় ফাঁক হয়ে ছিল। চিউইং গামটা মুখেই
চলে গেছিল ওর। থু থু করে ওয়াক ওয়াক করে ফেলে দিতে দিতেই একটা ছোট্ট ধাক্কা দিল
অভ্রের বুকে। বন্ধুরা এই এই করে চেঁচিয়ে ওঠার আগেই সম্যক জ্ঞান থেকে আন্দাজ করল,
এই মুহুর্তে দুপাশে যথাক্রমে মিষ্টির দোকানের অচিন্ত্যকাকা আর ফাস্ট ফুডের দোকানের
রঞ্জিত দা তাকে দেখে ফেলেছে। অন্য কিছু ভাবার আগেই বাঁ গালে একটা থাপ্পড় খেল অভ্র
আর ঘুমটা ভেঙ্গে গেল তার।
কি আশ্চর্য, কি
ডেসপারেট অবস্থায় গেলে তবে এই রকম স্বপ্ন দেখা যায়। সাবকনশাস মাইণ্ডে কি চলছে সেটা
জানতে পেরেই আজ এই তড়িঘড়ি অভ্রের বাজারে এসে দাঁড়িয়ে থাকা। বেশি কিছু না, নামটা
জানবে আর ফোন নাম্বারটা চাইবে। এমন কিছু ব্যাপার না।
প্রায় দশ মিনিট
আরো পেরিয়ে গেল। মেঘটা এবার একদম মাথায় এসে গেছে। রোদের লেশ মাত্র নেই কোথাও। সন্ধ্যা হবার মত
মুহুর্ত। বৃষ্টি ভেজা অভ্রের একদমই পছন্দ না। কিন্তু হঠাত দেখল টপ করে ঠিক
ব্রহ্মতালুতে একফোঁটা জল পড়ল। ঠিক সেই সময়, ঠিক সেই সময় মেয়েটাকে দেখতে পেল অভ্র।
মোড়ের আইস্ক্রিমের দোকানের সামনে টার্ণ নিচ্ছে। আজ একটা কাঁচা সবজেটে রঙের সালোয়ার
কামিজ পরেছে সে। পাশে চারজন বান্ধবী, আর একজন বন্ধুও রয়েছে। পাঁচজন, আর ও একা।
বুকটা ঢিপ ঢিপ করে উঠল। এমন একটা কোনে দাঁড়িয়েছে যে চট করে দেখা যায় না। মেয়েরা
ওকে পেরিয়ে গেল। তখনই সাইকেলটা চাবি লাগিয়ে ব্যাগটা যেমন ছিল রেখে এগোল অভ্র। মনের
জোর এমনই, যে একদম এসপার ওসপারের সিদ্ধান্তে অনড়। আটা ময়দা কি সব কেনার ছুতোয়
বেরিয়েছিল। সেগুলোতে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে - খেয়ালই হল না। দু-তিন
কদম হাঁটতেই ধরে ফেলল দলটকে। একটু মুখ বাড়িয়ে আগের দিনের ঢঙেই বলল, 'এক্সকিউজ মি'।
এরই মধ্যে ঠিক সেই মুহুর্তেই কোথায় কাছে একটা বাজ পড়ার শব্দ হল প্রচণ্ড শব্দে। এর
পর যেটা ঘটল সেটার জন্য শুধু অভ্র কেন, বাকি পাঁচ জনের কেউই প্রস্তুত ছিল না।
মেয়েটা মুখ ঘুরিয়ে অভ্রকে দেখেই 'অ্যা?' বলে কেমন বেসামাল হয়ে পড়ল। ওপাশে একজন
বান্ধবী তার বাঁ হাতটা ধরেই ছিল। সে কেমন ভ্যাবাচাকা খেয়ে পিছন দিকে ধরতে গেল
কিন্তু তাল সামলাতে পারল না। একজন ছেলে, সে পিছনে ছিল, পিছনেই রয়ে গেল। কেন কে
জানে, সে ধরল না। মেয়েটা ধুস করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সটান। কি ঘটেছে বুঝতে বুঝি
সবার দু-সেকেন্ড সময় লাগল। বাজার পেরিয়ে আরো দু-কদম এগিয়ে এসেছিল ওরা। ওদিকে বাজারে
কে বলে উঠল, 'কি হল রে?' পাশে কোন দোকান ছিল না। বাঁ পাশে পুকুর ঘাট। ডান পাশে আধা
খাপছাড়া তৈরি একটা দোকান ঘর, ফাঁকা। সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল এবার মেয়েটার ওপর। পাশের
বেঁটে গোছের বান্ধবী বলল, 'এই তিন্নি, তিন্নি? কি হল তোর?' তার গালে আলতো হাত
বোলাতে বোলাতে মেয়েটা এবার অভ্রের দিকে চাইল ফ্যালফেলিয়ে। মাথার কাছে বসা মেয়েটা
অভ্রকে বুঝি এর আগে দেখতে পায়নি। সে অভ্রের দিকে চেয়েই এই সিরিয়ার অবস্থার মধ্যেও
ফিক করে হেসে ফেলল। ব্যাপারটা মোটেই অভ্রের ভাল লাগল না। ছেলেটা এতক্ষণে সম্বিত
পেয়েছে। অভ্রের দিকে ফিরে বলল, 'দাদা, কি করলে এটা! মনে হয় অজ্ঞান হয়ে গেছে। জল
দাও ওকে।' অভ্র সবার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে পুকুর ঘাটের দিকে ছুটল।
************************************************
এত সকালে অভ্রের
ঘুম ভাঙ্গে না, কিন্তু ফোনটা যে বেজেই চলেছে। প্রথম কলটা সাইলেন্ট করে দেবার পর
আবার কল আসায় এবার অভ্রকে ধরতেই হল ফোনটা। অচেনা নম্বর। বিছানা থেকে অর্ধেক মাথা
তুলে পায়ের কাছে আলমারির কাঁচে মুখটা দেখে নিল অভ্র। একমাথা এলো মেলো চুল। চোখ
গুলো ভারি। -'হ্যালো। কে?' ওপার থেকে বয়স্কা নারী কণ্ঠ, 'আপনি কি অভ্র বলছেন?'
-'হ্যাঁ, বলছি, আপনি কে... মানে, আমি কার সাথে কথা বলছি?' অভ্রর চটকা ভাংতে শুরু
করেছে। -'আমি অনন্যার মা বলছি।' অভ্রের মাথায় ঢুকল না। -'কে অনন্যা?' -'মানে? আমার
মেয়েকে উত্যক্ত করলে তুমি, বাজারের মাঝখানে ওই এলাকায় লোক জড়ো করলে তুমি, রিকশ'
করে ডাক্তারখানা নিয়ে গিয়ে ওষুধ খাইয়ে বাসে তুলে দিয়ে এলে তুমি, আর এখন বলছ কে
অনন্যা? ছোঁড়া, তুমি কি নেশা টেশা করো নাকি?' ঢোক গিলল অভ্র। ঘুমটা একদম ছুটে
গেছে। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে। গায়ের চাদর মেঝেয় লুটিয়ে গেল। তাড়াতাড়ি দরজা
দিয়ে বারান্দায় বেরিয়ে অভ্র আমতা আমতা করে বলে উঠল, 'না, মানে... আন্টি...,
আপনি...'। ওপারে ভারী স্বর আবার, 'বুঝেছ তাহলে।' ফ্যাসফ্যাসে গলায় অভ্র বলল,
'আন্টি, আপনার মেয়ের নামটাই তো আমি জানতাম না আগে। আই অ্যাম স্যরি...। মানে...।'
-'এত মানে মানে করার কি আছে? ওর ডাকনাম তিন্নি, স্কুলের নাম অনন্যা।... যাই হোক,
শোনো যেটা বলি, 'তুমি আজ সকালেই আটটার মধ্যে আমাদের বাড়ি আসবে। মেয়ের নামই যখন
জানো না তখন বাড়িও চেনো না নিশ্চয়ই।' -'না, মানে...'। -'ঠিক আছে ঠিক আছে। মোড়ের
ওখানে বাস ধরে জগতবল্লভপুরের মোড়ে নেমে পোড়ো। ওখানে সরকারদের বাড়ি জিজ্ঞেস করলে যে
কেউ দেখিয়ে দেবে...'। অভ্রের ভয় হল, প্যাঁদানোর ধান্দা নয় তো? সে রেখে ঢেকে
জিজ্ঞেস করেই ফেলল, 'মানে... উদ্দেশ্যটা কি বলতে পারেন আন্টি?' দু সেকেণ্ডের
নীরবতার পর ওপাশের স্বর নরম হল, হালকা হাসির সাথে কথা এল, 'ছোকরা, তোমার বাবাকে
আমি বেশ ভাল ভাবে চিনি। মেয়ে আমার সেদিন বাজ পড়ার আওয়াজে অজ্ঞান হয়ে গেছিল। তুমি
হেল্প করেছ। মেয়ের বন্ধুরাও সব খুলে বলেছে আমাকে। পেটাতে নয়, মিষ্টিমুখ করাতে
ডাকছি তোমাকে।'
---------------------------------------------------------
13-June-2016, Afternoon.