৩০ জুলাই - রাত ১২.১৬
এসইউভি টা অনেকক্ষণ থেকে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার একদম ধার ঘেঁষে। চওড়া হাইওয়ের শুনশান দুপুরটা কটকটে রোদ্দুরে এক্কেবারে চুলোর মত জ্বালাদায়ক। মাঝে মাঝে উড়ো মেঘের আশীর্বাদে বোধ করি রাস্তাটা নিঃশ্বাস ফেলছিল শোঁ শোঁ করে। নিঃসাড় হাইওয়েতে কোনো শব্দই নেই তাই গাড়ির ভেতরের চলমান এসিটার ও শব্দ শোনা যায়। ড্রাইভার সীটের কালো কাঁচটা অল্প করে নামিয়ে পথিক একটা ইম্পোর্টেড সিগারেট ধরাল অন্যমনস্কভাবে। একদৃষ্টে রাস্তার ওপারে চেয়ে আছে।
রাস্তার অপর পারে একটা খাল পেরিয়ে বেশ বড় একটা জমি অ্যাকোয়ার করা হয়েছে। বড় বড় করে গর্ত খুলে খুলে মাপা দূরত্ব বরাবর পিলার বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। মাটিতে ঘুঁটে দেবার মত করে এদিক ওদিক এখন ও জোলো বনকচু আর ঘেঁটু গাছের জঙ্গল রয়ে গেছে। সপ্তাহ তিনেকের মত সময় ধরে কনস্ট্রাকশনের কাজ একদমই বন্ধ হয়ে পড়ে আছে বিশেষ কারণ বশত। তাই ভেতরে জনমানব নেই। ঢোকার মুখে একজন গার্ডের বসে পাহারা দেওয়ার কথা, যদিও এখান থেকে তাকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে ন। পুরো এলাকাটা এমনিতে ঘন করে কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা, তাই ভেতরে মানুষ - মায় কুকুর-ছাগল পর্যন্ত ঢুকতে পারার কথা না। তবু, ভেতরে দুটো কুকুরছানা খেলা করার ভঙ্গিতে লাফিয়ে বেড়াচ্ছিল।
আশ্চর্য! কুকুরছানাগুলো ঢুকল কেমন করে? পথিকৃৎ মজুমদার গাড়ির দরজা খুলে নেমে দাঁড়াল রাস্তায়। সাদা পেপে জিন্সের টিশার্টের সাথে কার্গো জিন্স, চোখে ওয়েফারার গ্লাস। সিগারেটটা ফেলে দিয়ে চট করে রাস্তা পার করে নিল সে। খাল পেরিয়ে সামনেই একটা প্রকাণ্ড শিমুল গাছ। গাছের পিছনেই চওড়া একটা টেম্পোরারি কাঁটাতারের দরজা। তার পাশেই সাইনবোর্ড - মজুমদার ইন্ডাস্ট্রিজ। আন্ডার কন্সট্রাকশান। গাছের নরম ছায়ার নীচে প্লাস্টিকের চেয়ারটা ফাঁকা। গার্ড বাবাজি হাওয়া। অদূরেই খান্না মেশিনারিজের একটা নতুন প্রোডাকশান সেন্টার চালু হয়েছে। সেখানে এলাকাটা একটু জমজমাট। দুপুরে ওখানে লরি ড্রাইভার গুলো লাঞ্চ সেরে ছাউনিতে বসে তাস পেটে। নির্ঘাৎ সেখানেই গিয়ে বসে আছে। যাক গে। গাড়িটা লক করে এসেছে কি না ভেবে নিয়ে পথিক জিন্সের ছোট পকেট থেকে একটা চাবি বের করল আর ছোট সাইড-দরজাটা খুলে ঢুকে পড়ল।
ভেতরে এদিক ওদিক বালির ঢিবি - ইটের লাট - স্টোনচিপের ডাঁই। বেশ একটা ভুলভুলাইয়া গোছের জায়গা এই ঢোকার মুখটা। এখানে সব জায়গায় ফোনে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। পশ্চিমের দ্বিতীয় পিলারের সামনে দাঁড়ালে একদম সিগন্যাল থাকে না। সেখানেই পথিক একটা কাটা গোলঞ্চ গাছের গুঁড়ির ওপর বসে পড়ল, হাতের ক্যারিব্যাগটা নামিয়ে রাখল পায়ের কাছে। মনটা আজ ওর ঠিক ভাল নেই। গত কয়েকমাস ধরেই এরকম হঠাৎ হঠাৎ অনুভব হচ্ছে ওর। ঠিক কি হচ্ছে বা কেন হচ্ছে তা ওর নিজের পক্ষেই গুছিয়ে বুঝে ওঠা অসম্ভব। হঠাৎ করে মনে হয় পারিপার্শ্বিক সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে খুব শিগগির অন্য কোনো জীবনে ঢুকে পড়ে সময়টা বদলে ফেলা অত্যন্ত প্রয়োজন। জটিলতা কাটিয়ে একটা শিশুসুলভ জীবন - যে জীবন সহজ-সরল-বন্ধুবৎসল। যেখানে মানুষ ওকে টাকায় চিনবে না, চিনবে নাম ধরে। এক ডাকে যেখানে কেউ ছুটে চলে আসবে একলা লাগা রাতের ছাদে। কথা বলার মত কেউ বা সাথে মারামারি করার মত একটা কেউ। একটা শুকনো গোলঞ্চ ফুল একটা সরু ডালে লেগে ছিল। ফোন চেক করল - নেট ওয়ার্ক ফাঁকা। তারপর ফুলটা তুলে তার ওপর ফোনটা রাখল সে।
দুপুর গড়িয়ে তিনটে বেজেছে। পেট ক্ষিধেয় চুঁই চুঁই। অথচ সাথে তেমন কিছুই খাবার মত নেই। ক্যারি ব্যাগে বাঁধা আছে পার্সেল্ড চিকেন টিক্কা আর রুমালি রুটি। তাতে মন লাগছে না। মনের এখন খেলার সময়। স্মৃতির এডাল ও ডাল ঘুরে মন ভরানোর সময়। চট করে তাই স্কুলবেলার একটা কথা মনে পড়ে গেল।
বেবিসিটার স্বপ্না আন্টি একরকম পারমানেন্টই হয়ে গেছে তখন এই বাড়িতে। পথিকের দেখভালের বেশ কিছুটা দায়িত্ব নেয়া, স্কুলে পৌঁছে দেয়া এইসব। মা তখনও বেঁচে আছেন। বাড়ির রান্নাটুকু মা-ই করত। প্রত্যেক দিন ঘড়ি ধরে ঠিক সাড়ে ছ'টার মধ্যে ব্রেকফাস্ট রেডি। ব্রেকফাস্ট করে উঠতে না উঠতেই হাতে পেয়ে যেত লাঞ্চবক্স। মায়ের জীবনে কোনো আড়ম্বর ছিল না। ভোরে উঠে স্নান সেরে পুজো ঘর। তার পর রান্না ঘর, তারপর ঘর পরিস্কারের কাজ সেরে ডান্স স্কুল আর সেখান থেকে ফিরে ব্যবসার অফিশিয়াল কাজ কাম দেখে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সাতটা আটটা এমনিই বেজে যেত। ব্যবসার অনেকটা কাজ দেখাশোনা করলেও মায়ের কোনো পার্টি ফার্টিতে যাবার অভ্যাস ছিল না। সেদিন পথিক কে পিক আপ করতে এল মা। গাড়িতে উঠে সীট বেল্ট বেঁধেই মা দেখে নিয়েছে পথিকের সাথে লাঞ্চবক্সটা নেই। জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারল যে যাবার পথে কোথায় পড়ে গেছে মনে করতে পারছে না। দুপুরে লাঞ্চ হয়নি। ভীষণ বকুনি খেয়েছিল তারপর গাড়িতে ফিরতে ফিরতে। তাই নয়, আবার পথে শুগার এণ্ড স্পাইসে গাড়ি দাঁড় করিয়ে কেক কিনিয়েছিল। ক্ষিদের মুখে ও-ইই সব। দাঁড়িয়েই ওই অবস্থায় একটা খেয়ে নিয়েছিল পথিক। ফের গাড়িতে ওঠার পর মা এক্কেবারে চুপ। চকোলেট কেকে কামড় বসাতে বসাতে পথিক লক্ষ্য করেছিল মায়ের চোখের কোনে জল। কি কারণে, ভেবে বুঝতে পারেনি ওই বয়সে। ডাইভার্সানের জন্য মা মিউজিক সিস্টেমটা চালু করে দিয়েছিল। এফ এম - তখন সবে কোলকাতায় এফ এম চ্যানেল গুলো চোখ মেলতে শুরু করেছে।
টুং। ফোনে আওয়াজটা শুনে বোঝা গেল নেটওয়ার্ক এসেছে এবং হোয়াটস্যাপে কেউ ডাক দিয়েছে। অরিজিৎ-পার্থ-অয়ন যে কেউ হবে। সাড়ে চারটেয় ক্লাবে যেতে বলবে। অমুক তমুক ফিরস্তি। অন্য সময় হলে ফোনটা চেক করত, এখন পড়েই রইল। পেটে ক্ষিধে, মনে মিছিমিছি শুগার এণ্ড স্পাইস। না, শুগার এণ্ড স্পাইস নয়, ওটা মায়ের আদর। চার বছর হল ঝাল-মিষ্টির স্বাদ পায়নি পথিক। পাবেও না আর। মায়ের পর ব্যবসার দায়ভার গিয়ে মেসোমশায়ের হাতে পড়ে। রান্নার দায়ভার পড়ে স্বপ্না আন্টির ওপর আর পথিকের হাতে পড়ে টাকা। ল-ইয়ার আঙ্কল মাঝে মাঝে এসে কাজ টাজ বুঝিয়ে দিয়ে যেতেন - ব্যাস ওই টুকুই।
একটু সমঝদার হবার পর নতুন ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান করল মেসোমশাইয়ের সাথে - বছর দুয়েক আগে। আর তার পর থেকেই এই অদ্ভুত রোগে পেয়েছে ওকে। সেকেন্ড ইয়ারের সায়েন্সের স্টুডেন্ট পথিক। ফার্স্ট ইয়ারে অল্প আধটু কলেজ গেলেও এখন আর একদম কলেজ অ্যাটেণ্ করে না। বন্ধুগুলোই আসলে কেউ সুবিধের না। বাবা মা না থাকার কারণে এই বয়সেই চোখ একটু বেশি খোলা থাকে পথিকৃতের। মানুষ চেনে ভাল। তাই কলেজ যায় না বড় একটা। মাঝে মাঝে মায়ের শেলফের বইগুলো খুলে খুলে দেখে। পড়ে না, খোঁজে। ছবি খোঁজে। মাকে চেনার অনেক বাকি রয়ে গেছে। পুরানো কোনো ছবি যদি হুট করে বেরিয়ে আসে আর তাহলে যদি আর একটু চেনা যায়...। ছবি পায়নি, একটা রিপোর্ট পেয়েছিল। বাবার মেডিকাল টেস্টের রিপোর্ট। ইন্টারনাল ব্লাড ক্লটিং থেকে সেরিব্রাল স্ট্রোক - তবু সারভাইভালের পসিবিলিটিজ ছিল। এমনই লেখা ছিল রিপোর্টে। রিপোর্টটা বাবার ছুটি হয়ে যাবার দুসপ্তাহ আগের। মায়ের কাছে এটাই ছিল শেষ ভরসা। হয়ত এটা খুলে খুলে দেখত আর ভাবত বাবা সেরে উঠবে। মায়ের আরেকটা ইউনিকনেস ছিল। আদরের নাম ডাক - বিট্টু! এই নামে শুধু মা-ই ডাকত ওকে।
একদিকের ফরসা গাল রোদে লাল হয়ে উঠেছে। অন্যমনস্কভাবে গালে একটা হাত চালিয়ে নিয়ে দেখল বাদামী রঙের একটা কুকুরছানা সামনে এসে পড়েছে। টলটলে পায়ে এদিক সেদিক লাফাচ্ছে কিন্তু শব্দ করছে না আর কাছেও আসছে না। ছানাটার শরীরটা কিঞ্চিৎ শীর্ণ, কান গুলো নোয়ানো, চোখ গুলো গভীর। পথিকের মায়া লাগল। বেচারা ছানাটা ভেতরে হয়ত ঢুকে পড়েছে, আর বের হতে পারেনি। ক'দিন না খেয়ে আছে কে জানে। ক্যারিব্যাগ থেকে চিকেন টিক্কার প্যাকেটটা বের করে এক টুকরো ছুঁড়ে দিল, যদি খায়। ছানাটা মুখ নিয়ে গিয়ে শুঁকল দুবার, আর তার পর টিলটিলে পায়ে কোথায় স্টোনচিপের ঢিবির পেছনে উধাও হয়ে গেল। আশ্চর্য কিউট এই বাচ্চাটা। পথিককে বেশ টেনেছে। খাবারের প্যাকেটটা নিয়ে ও উঠে পড়ল। দুটো টিলা পেরোতেই সামনের ইটের পাঁজার পেছনে বাচ্চাটা উঁকি দিচ্ছে। সাথে আরো একটা - দ্বিতীয়টা পুরোপুরি কালো।
আর দুপা এগোতেই যেটা দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল, সেটার জন্য পথিক এক্কেবারে প্রস্তুত ছিল না। ছেঁড়াফাটা ত্রিপলে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ইটের পাঁজার সাথে মিলিয়ে বানানো একটা টেম্পোরারি তাঁবু। পাশে এদিক ওদিক ছড়ানো ভাঙাচোরা ব্যবহার সামগ্রী আর কাপড়। প্রমাদ গুণল পথিক - এলাকাটা ভাল না, চোর-ডাকাতের উৎপাত লেগেই থাকে, সাথে খুন ও। কোথায়া কে খুন হয় আর হাইওয়ের ধারে নালায় বনে ঝোপে লাশ ফেলে দিয়ে যায়। দেখার লোক নেই। গতকালই একটা ন'-দশবছরের বাচ্চা মেয়ের লাশ খান্না মেশিনারিজের ওদিকে কোথায় পাওয়া গেছে। শোনা গেছে রক্তারক্তি কেস। বাকিটা পুলিশ জানে। এরকম এলাকায় একটা ব্যক্তিগত জমির মধ্যে লুকিয়ে তাঁবু ফেলাটা আশ্চর্যের। গার্ড বাবাজির কপাল খারাপ। বেশ কিছুটা কৈফিয়ত দিতে হবে আর ধমক ও খেতে হবে মেসোমশাইয়ের কাছে। নিঃশব্দে পা ফেলে তাঁবুর মুখের কাছে গেল পথিক। এবার দ্বিতীয় চমক। অত্যন্ত ছোট পাতা একটা সংসারের মধ্যে অগোছালো শুয়ে ঘুমিয়ে আছে একটা বছর চারেকের নরম শিশু। কন্সট্রাকশানের কাজ বন্ধ আছে আজ বাইশ দিন - তাঁবুটা দুসপ্তাহ আগেও পাতা হয়ে থাকতে পারে। কুকুরছানাগুলো পিছন দিক থেকে দৌড়ে এসে এবার পথিকের পায়ের ফাঁকে গলে বাচ্চাটার কাছে গিয়ে ডাকতে শুরু করল। পথিকও মুখ খুলল, 'এই কে রে তুই?'
বাচ্ছাটা ঘুমিয়েই আছে। কোনো সাড়া নেই। আর দুবার ডাকার পরেও সেই একই অবস্থায় - নড়ছেনা। পথিকের সন্দেহ হল। কাছে যেতে ভয় হচ্ছিল, তবু উপায় নেই দেখে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। ফোনে ঘড়ি দেখল - আর ক্যামেরাটা খুলে দুটো ছবি তুলল। পার্থ আর অয়নকে ছবিগুলো সেণ্ড করতে গিয়ে দেখে আবার নো নেট ওয়ার্ক কভারেজ অবস্থা। ফোনটা এবার সে ঢুকিয়ে রাখল। গুঁড়ি মেরে ছোট্ট তাঁবুতে ঢুকে বাচ্চাটার কপালে হাত দিয়ে দেখল। ভেবেছিল ঠাণ্ডা হবে। তা নয়, গরম আছে। ঝড়ের মত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল পথিক। আবার হাত দিল কপালে। শুধু গরমই নয়, বেজায় গরম। জ্বরের ঘোরে অজ্ঞান হয়ে থাকতে পারে। আর দুচার বার তাকে ঠেলা দিতে বাচ্ছাটা একটু নড়ল। এবার ক্যারিব্যাগ থেকে জল বের করে পথিক আছড়া দিল বার দুয়েক। জল দিয়ে মুখটা মুছিয়েও দিল। কে জানে কোন অবস্থায় এর পরিবার পরিজন একে ফেলে রেখে গেছে। বাচ্ছা ছেলে - খাবারই বা পাবে কি করে আর থাকবেই বা কার কাছে। কুকুরের ছানাগুলো এক্কেবারে ভেতরের কোনে ঢুকে গুঁড়ি মেরে বসে আছে। ছেলেটাকে পথিক কোলে তুলে বাইরে বের করে আনল। ছেঁড়া মাদুরটা বিছিয়ে তাতে শুইয়ে দিয়েছে ত্রিপলের হাল্কা ছায়ায়। জল দিয়ে ভাল করে কপালে মুছিয়ে হাত বোলানোতে মিনিট দুয়েক পর বাচ্ছাটার জ্ঞান হল। তোতলা স্বরে ডেকে উঠল, 'দিদি!'
এবার পথিক দুহাতে বাচ্ছাটাকে ধরে ঝাঁকাল, 'এই, এই, কে তুই, ওঠ শিগগিরি!' জ্ঞান হওয়া দরকার। মনে হয় ডিহাইড্রেশান হয়ে গেছে। উঁকি মেরে তাঁবুর ভেতরে দেখল, কোথাও একবিন্দু খাবারের চিহ্ন নেই। বাচ্ছাটা চোখ মেলে পথিককে দেখছে, 'দিদি কই?'
'কে দিদি? নে, জলটা খা।' বোতলের ছিপিতে করে কয়েকবার অত্যন্ত যত্নে ও বাচ্ছাটাকে জল খাওয়াল। উঠে বসছেনা বাচ্ছাটা। মনে হয় দুর্বল হয়ে আছে। খাবার দেবে কি? ব্যাগে আছে চিকেন টিক্কা আর রুমালী রুটি। ঝটপট বের করে আনল খাবারগুলো। আকাশে এই মুহুর্তটা বড় একখণ্ড মেঘ টেনেছে। রোদটা ঢেকে গেছে - ঈশ্বরের অসীম দয়া।...
*******************
সন্ধ্যে সাড়ে ছটা বাজে। ক্লাবঘরের দোতলায় বড় একটা কেউ ওঠেনা। দোতলার পশ্চিমের ঘরের বিছানায় বাচ্ছাটা শুয়ে আছে। পার্থ, অয়ন, অরিজিৎ আর ভিক্টরকে নিয়ে বসে আছে পথিক। একদফা ডাক্তার দেখে গেছে এর মধ্যেই। থানাতেও খবর গেছে কিছুক্ষণ আগে - পুলিশ এসে পড়ল বলে। বাচ্ছাটা এতক্ষণে যা বলেছে তাতে জানা গেছে দিদিকে নিয়ে এক সপ্তাহ আগে এসে পথিকদের কন্সটাকশান সাইটে কোনোক্রমে ঢুকে ঘর বানিয়েছিল ওরা। দিদিই দেখ-ভাল করত। ভিক্ষে করত মনে হয়। বিকালে ফিরে আসত খাবার দাবার আর কাঠকুটো নিয়ে। রাত্রে জ্বেলে রাখত প্রয়োজনে। কুকুরছানাগুলোও এখানেই পায় ওরা। কদিন থাকার পর সব অভ্যাস হয়ে যায়। দিদি সকালে বেরিয়ে যায় আর সন্ধ্যায় ফেরে খাবার দাবার নিয়ে। কিন্তু গত পরশু আর ফেরেনি।
ওর মাথায় চট করে এসে যায় বাচ্ছা মেয়ে খুনের ব্যাপারটা। বয়স ও মিলে যায় - গল্পটা শুনে সেই মেয়েটাই মনে হয়। ব্যাপারটা জানানো হয়না বাচ্ছাটাকে।
পৌনে সাতটা বাজে। পশ্চিমের জানালায় নারকেল গাছের মাথায় বেগুনি আকাশ। কুকুরছানাগুলো পথিকের পায়ে এসে মুখ ঘষতে শুরু করেছে এবার। পথিক পা সরিয়ে নেয় না। তাঁবুতে থাকার সময় রুমালি রুটির দুটো ছাল খেয়েছিল ছানাগুলো। এখন ও বোধ হয় দুধেরই বয়স। তাই খাবারে মুখ দেয় না বড় একটা।
অনেকক্ষণ কথাবার্তা চলার পর বাচ্ছাটাকে কাছাকাছি কোনো হোমে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হল। পথিকের ব্যাপারটা মনোমত হচ্ছিল না, তবুও সে ধীরে ধীরে নিমরাজি হল।
এবারের দৃশ্যটা বেশ আলাদা। সবাই বেরিয়ে যাবার পরেও পথিক বসেই আছে খাটে - শিশুটার পাশে। অদ্ভুত তৃপ্তিতে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে আর দ্বিগুণ তৃপ্তিতে চোখ বুজে আছে বাচ্ছাটা। জ্বরটা এখন ও নামেনি।
মনের মধ্যে ভাবনার একটা মৃদু ছটফটানি লক্ষ্য করছিল পথিক। অনেকদিন এমন মনে হয়নি। বাচ্ছাটার মধ্যে একটা কি টান আছে। এ টান অনেকদিন অনুভব করেনি ও। একটা ভিন্ন জীবনের টান - একটা ফুটফুটে স্বপ্ন - যেটা কতদিন দেখেনি সে।
পুলিশের কাজকর্ম মেটার পর পুলিশকর্তা বলেছিলেন, 'বাচ্ছাটাকে খুব শিগগিরই কোনো হোমে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করতে হবে।' পথিক চোখে হেসে বলেছিল, 'হোম, স্যার ঠিকই বলেছেন। হোম। বাচ্ছাটার ঘরে ফেরার বড় দরকার।' গাড়িতে এসে বসেছিল পথিক। পাশের সিটে বাচ্ছাটা আর পেছনের সিটে কুকুরছানা গুলো। তখন বেশ স্পষ্টই সন্ধ্যে নেমেছে। সিটবেল্টটা বেঁধে দিয়ে চাবি ঘুরিয়ে স্টার্ট দিতে দিতেই আকাশের তারাদের মধ্যে থেকে একটা তারা পথিককে উদ্দেশ্য করে আকাশবানী শুনিয়েছিল, 'বাচ্ছাটার সত্যিই একটা পরিবারের বড্ড প্রয়োজন। আর তার থেকেও বেশি প্রয়োজন তোর, বিট্টু।'

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন